বাংলাদেশের ক্রিকেটটা তখন অন্ধকারে দিক হারিয়ে বসে আছে। পথ চলা ভীষণ দায়। সেই ঘুটঘুটে আঁধারের প্রাচীর ভেদ করে আলোকবর্তিকা হাতে যেন তাঁর আগমন। দুনিয়া জুড়ে খবর রটল, একজন এসেছে বাংলাদেশের আধভাঙা জাহাজের নাবিক হয়ে। লিকলিকে গড়নের শরীরটা তাঁর স্বপ্ন লিখতে থাকে, এক নম্বর আসনটা আমার, আমিই নম্বর ওয়ান। অবিশ্বাস্য সেই গল্পের লেখকের নামটা সাকিব আল হাসান।
১৯৮৭ সালে মাগুরার নিভৃত এক কোণে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটার গল্পটা ঠিক রূপকথা নয়, বরং সংগ্রাম, জেদ আর অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাসে লেখা এক বাস্তব মহাকাব্য। ছোটবেলায় ব্যাট-বল হাতে দাপিয়ে বেড়ানো সেই চঞ্চল ছেলেটাই একদিন হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে নির্ভরতার প্রতীক, কে ভেবেছিল!
প্রতিভার তেজ এতটাই প্রখর, বহুদূর থেকেও তাঁর আঁচ গায়ে লাগে। তাই তো আলোয় আসতে খুব বেশি সময় লাগেনি সাকিবের। ১৯ বছর বয়সেই জাতীয় দলের দরজা খুলে যায় তাঁর জন্য।
শুরু থেকেই আভাস ছিল, সাকিব বড় নাম হবে, তবে সেটা কত বড়? কেউ জানত না। বাংলাদেশ ক্রিকেট নিয়ে যে বড় স্বপ্ন দেখাটা তখন শোভা পায় না। তবে সাকিবের ভিন্নতা ঠিক এখানেই ছিল। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখতেনই না, দেখাতেও জানতেন।

২০০৭ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক, শুরুটা ছিল নীরব, কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই জমছিল এক ঝড়ের পূর্বাভাস। ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাত উইকেট, বাংলাদেশি বোলিং ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক! সেই ম্যাচেই যেন ক্রিকেটবিশ্ব প্রথমবার বুঝতে শুরু করল— এই ছেলেটা আলাদা, একেবারেই অন্যরকম।
তারপর? ব্যাট হাতে রানের পর রান, বল হাতে ভাঙন ধরানো স্পেল, একজন অলরাউন্ডার নয়, তিনি হয়ে উঠলেন একাই পুরো একটা দল! ওয়ানডে ক্রিকেটে ছয় হাজারের বেশি রান, ২৭০-এর বেশি উইকেট, সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো সেই স্বপ্ন দেখানোর বীজমন্ত্র ছিল।
ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটা খোদাই করলেন আরও বড় করে। সবচেয়ে দ্রুত ৫ হাজার রান আর ২৫০ উইকেটের ডাবল! এ যেন পরিসংখ্যানের খাতায় নিজের একচ্ছত্র রাজত্ব ঘোষণা।
২০১২ এশিয়া কাপ, পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে একাই টেনে নিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। ২৩৭ রান, ৬ উইকেট, সেরা খেলোয়াড়ের মুকুটটা যেন তাঁর মাথার জন্যই বানানো ছিল।

আর ২০১৯ বিশ্বকাপ? ওটা ছিল এক মহাকাব্য! ৬০৬ রান, গ্রুপ পর্বে সর্বোচ্চ, ভেঙে দিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকারের রেকর্ড। প্রতিটা ইনিংসেই যেন ছিল একটা করে স্টেটমেন্ট, ‘আমি শুধু খেলছি না, আমি ইতিহাস লিখছি!’
দীর্ঘ ক্যারিয়ার জুড়ে দলের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে থেকেছেন সাকিব। উইকেট দরকার, সবাই হাপিয়ে উঠেছে, সাকিব এসেই কাজটা শেষ করেছেন। পার্টনারশিপ দরকার, সাকিব ব্যাট হাতে এগিয়ে এসেছেন। বুঝিয়ে গেছেন তিনি বিশেষ ধাতুতে গড়া।
তিন ফরম্যাটেই বিশ্বসেরা হয়েছেন। ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করেছেন দীর্ঘ সময়, সমীহ আদায় করেছেন নামজাদা সব প্রতিপক্ষের।সাকিব আল হাসান তাই একটা নাম না, একটা যুগ। যেখানে প্রতিটা বাঁকেই লড়াই, প্রতিটা অর্জনেই বিস্ময়, আর প্রতিটা পদক্ষেপেই লেখা হয় নতুন ইতিহাস।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের যত গৌরব, যত স্বপ্ন, তার অনেকটা জুড়ে আছে এক মানুষের নাম। তিনি আলো, তিনি পথপ্রদর্শক, তিনি সেই নাবিক, যিনি বারবার ভাঙা জাহাজকে টেনে এনেছেন তীরে। বাংলাদেশ বলার মতো তেমন কিছুই হয়তো করতে পারেনি, বিশ্বসেরার কাতারে জায়গা হয়নি ঠিকই। তবে বাংলাদেশের যা ছিল, তা অন্যদের ছিল না। বাংলাদেশে একজন বিশ্বসেরা ছিল, বাংলাদেশ একজন সাকিব আল হাসানকে পেয়েছিল।












