ফুটবল কেবল ২২ জন মানুষের চামড়ার গোলকের পেছনে ছোটা নয়। বিশেষ করে ব্রাজিলের কাছে ফুটবল হলো ধর্ম, আর মাঠ হলো উপাসনালয়। ১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামটি সেজেছিল সেই উপাসনার পূর্ণতা পাওয়ার জন্য। কিন্তু সূর্যাস্তের সময় সেই বিশাল স্থাপত্যটি পরিণত হলো বিশ্বের দীর্ঘতম এক শ্মশানে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে করুণ ট্র্যাজেডিটির নাম – ‘মারকানাজো’।
সেদিন মারাকানার আকাশ ছিল উৎসবের রঙে রঙিন। প্রায় দুই লক্ষ মানুষের গগনবিদারী চিৎকার রিও-র বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। উরুগুয়ের বিপক্ষে ফাইনালের আগেই ব্রাজিলীয়দের মনে শিরোপার উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল।
স্থানীয় মেয়র তো ঘোষণাই করে দিয়েছিলেন – ‘তোমরাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’ মাঠের এক কোণে রাখা হয়েছিল স্বর্ণের মেডেল, বাইরে অপেক্ষা করছিল বিশাল বিজয় শোভাযাত্রা। ব্রাজিলের শুধু প্রয়োজন ছিল একটি ড্র।

খেলার ৪৭ মিনিটে যখন ফ্রিয়াকা গোল করলেন, তখন গ্যালারির গর্জন আটলান্টিকের ঢেউকেও হার মানিয়েছিল। কিন্তু নিয়তি যেন আড়ালে বসে হাসছিল। ৬৬ মিনিটে উরুগুয়ের শিয়াফিনোর গোলটি ছিল ঝড়ের আগের পূর্বাভাস। আর ৭৯ মিনিটে আলসিদেস ঘিগিয়ার সেই ঐতিহাসিক শট যখন জালে জড়ালো, মারাকানা মুহূর্তেই এক জীবন্ত সমাধিস্থলে পরিণত হলো।
পরবর্তীতে ঘিগিয়া বলেছিলেন, ‘মারাকানাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কেবল তিনজনের ছিল – পোপ, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা আর আমি।’ সত্যিই তাই, সেই গোলটির পর দুই লাখ মানুষের কণ্ঠনালি যেন কেউ একযোগে চেপে ধরেছিল। সেই স্তব্ধতা ছিল শোরগোলের চেয়েও বেশি ভয়ংকর। খেলা শেষে রেফারির বাঁশি যখন বাজল, তখন উল্লাস নয়, শোনা যাচ্ছিল হাহাকার। অনেক দর্শক সেদিন গ্যালারিতেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকেই আবার গ্যালারি থেকে লাফিয়ে বেছে নেন আত্মহননের পথকে।
ব্রাজিল সেদিন তাদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সিটিকে ‘অপয়া’ ঘোষণা করে চিরতরে কবর দিয়েছিল। জন্ম নিয়েছিল আজকের বিখ্যাত হলুদ জার্সি। কিন্তু সেই হারের সবচেয়ে বড় বলি হয়েছিলেন গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসা। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে সেই এক গোলের জন্য অপরাধী হয়ে বাঁচতে হয়েছে। মৃত্যুর আগে আক্ষেপ করে তিনি বলেছিলেন – ‘ব্রাজিলে সর্বোচ্চ সাজা ৩০ বছরের জেল, কিন্তু আমি ৫০ বছর ধরে সেই অপরাধের সাজা টানছি যা আমি একা করিনি।’

মারাকানাজো কেবল একটি পরাজয় নয়, এটি ছিল ব্রাজিলের জাতীয় অহংকারের এক বিশাল চ্যুতি। আজও ফুটবলের প্রতিটি বাঁকে সেই বিকেলের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় – ফুটবল যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি তা কখনো কখনো আস্ত একটা জাতিকে আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো এক গভীর ক্ষতও উপহার দিতে পারে।











