রাগনিকের ট্যাকটিক্স কি টিকল মেসিদের সামনে?

ফুটবল আবারও দেখায়—কোনো একক দর্শন ম্যাচ জেতায় না। জেতে সেই দল, যারা দর্শনের ভেতর থেকেও সমাধান খুঁজে নিতে জানে।

রালফ রাগনিকের গেগেন প্রেসিং কি আর্জেন্টিনার মতো টেকনিক্যাল দলের জন্য অপ্রতিরোধ্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে? আর্জেন্টিনার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল এটাই। আর তাঁর জবাব লিওনেল স্ক্যালোনি দিলেন তাঁর ভিন্ন ধরণে ট্যাকটিক্স দিয়ে।

রাগনিককে সাধারণ ফুটবল ভক্তরা প্রথম বড়ভাবে চেনেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে তার সময় থেকে। ফুটবল-দুনিয়ায় ‘প্রফেসর’ খ্যাত রাগনিক আধুনিক প্রেসিং ফুটবলের ভাষা বদলে দিয়েছেন। তা,র গড়ে তোলা গেগেন প্রেসিংয়ের মূল কথা একটাই—বল হারালেই সঙ্গে সঙ্গে ছোট ছোট জোনে চারপাশ চাপ তৈরি করে প্রতিপক্ষকে সেখান থেকেই বের হতে না দেওয়া।

এই দর্শন তাকে ক্লাব পর্যায়ে বড় সাফল্য না দিলেও, তার ধারণাই পরে হয়ে ওঠে আধুনিক ইউরোপিয়ান ফুটবলের ভিত্তি। ইয়ুর্গেন ক্লপ কিংবা জুলিয়ান নাগেলসম্যান সেই আইডিয়াকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে বিশ্বজয়ের পথে হেঁটেছেন, এবং রাগনিককে দেখেছেন নিজেদের ‘ফুটবল গুরু’ হিসেবে।

এই ম্যাচে সেই রাগনিকই অস্ট্রিয়ার দায়িত্বে। আর স্বাভাবিকভাবেই, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তার অস্ত্র ছিল সেই গেগেনপ্রেসিং। ম্যাচের শুরু থেকে হাই প্রেসিং দিয়ে অস্ট্রিয়া আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। মেসির মিস করা পেনাল্টির পর আর্জেন্টিনার আক্রমণ কিছুটা থমকে যায়—আর সেই সময়টা ছিল অস্ট্রিয়ার প্রেসিংয়ের সবচেয়ে কার্যকর মুহূর্ত।

কিন্তু, গল্পটা এখানেই থেমে থাকেনি। কার্লো আনচেলত্তি আগেই বলেছিলেন, এই বিশ্বকাপ হবে হাই ইনটেনসিটির—যেখানে ইউরোপিয়ান দলগুলো দ্রুতগতির প্রেসিং ফুটবল খেলবে। তবে তিনি একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনার মতো দল, যাদের টেকনিক্যাল ইন্টেলিজেন্স আছে, তারা চাপের মধ্যেও সমাধান খুঁজে নিতে পারে।

এই ম্যাচে সেটাই দেখা গেল। গেগেনপ্রেসিং ভাঙার দুটি পথ আছে—প্রথমত, চাপের কারণে ফাঁকা হয়ে যাওয়া জায়গা দ্রুত কাজে লাগানো; দ্বিতীয়ত, বল পায়ে রেখে প্রেস রেজিস্ট্যান্স তৈরি করা। আর্জেন্টিনা দুটোই করেছে। আসলে তাঁদেরকে দিয়ে করিয়েছেন লিওনেল স্ক্যালোনি, দ্য ট্যাকটিক্যাল মাস্টারমাইন্ড।

লং বল দিয়ে তারা বারবার অস্ট্রিয়ার প্রেস ভেঙেছে—ডিফেন্স থেকে সরাসরি উইংয়ে, আবার মেসির মাধ্যমে ফ্ল্যাঙ্ক বদলে আক্রমণ সাজিয়েছে। একই সঙ্গে স্কালোনি ট্যাকটিক্যাল শিফট এনে দলকে কাগজে ৪-১-৩-২ হলেও বাস্তবে ৪-১-৩-১-১ কাঠামোয় নামিয়ে আনেন—ডিফেন্সের সামনে অতিরিক্ত একটি সুরক্ষা স্তর যোগ করে।

ফলে অস্ট্রিয়ার প্রেসিং যেমন তীব্র ছিল, তেমনি আর্জেন্টিনার বল বের করার পথও তৈরি হয়ে যায়। লিওনেল মেসি পৌঁছে যান ১৭ গোলের মাইলফলকে। আর এটাই র‌াগনিকের কৌশলের বিপক্ষে ছিল আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় জবাব।

গেগেনপ্রেসিং অস্ট্রিয়াকে লড়াইয়ে রেখেছিল, চাপ তৈরি করেছিল, মুহূর্তে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণও নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার টেকনিক্যাল ইন্টেলিজেন্স, ধৈর্য আর ট্যাকটিক্যাল অ্যাডজাস্টমেন্ট সেই চাপকে ভেঙে দেয়। ফুটবল আবারও দেখায়—কোনো একক দর্শন ম্যাচ জেতায় না। জেতে সেই দল, যারা দর্শনের ভেতর থেকেও সমাধান খুঁজে নিতে জানে।

লেখক পরিচিতি

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

Share via
Copy link