ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল!

ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে তখন ইংল্যান্ড দিশেহারা পথিকের মতো ধুঁকছে। অ্যালেস্টেয়ার কুকের নেতৃত্বাধীন থ্রি লায়ন্স দলের মনোবলটাও ঢের তলানিতে। দৃশ্যপটটা যেন এমন: “দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ/ ছিঁড়িয়াছে পাল কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত!”

২০১৪ সাল। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে তখন ইংল্যান্ড দিশেহারা পথিকের মতো ধুঁকছে। অ্যালেস্টেয়ার কুকের নেতৃত্বাধীন থ্রি লায়ন্স দলের মনোবলটাও ঢের তলানিতে। ওই সময় হাল ধরার হিম্মত ছিল একজনেরই।

তিনি ইয়ন মরগান। কুককে ক্যাপ্টেনসি থেকে সরানোর পর দলের নেতৃত্ব নিয়েই সাহসী পদক্ষেপ নেন এই আইরিশ তারকা। নব্বইয়ের দশকের নিষ্প্রভ ডিফেন্সিভ খেলার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলে টিমের ভেতরে আগ্রাসী চেতনার ভিত গড়ে তোলেন তিনি। যা বদলে দেয় পুরো ইংল্যান্ড দলের চিত্র।

মরগানের আনা সেই বিপ্লবের জেরে রেকর্ড বই নতুন করে লিখতে শুরু করে থ্রি লায়ন্সরা। সতীর্থদের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা গোটা ইংলিশ ড্রেসিংরুমকে নতুনভাবে উজ্জীবিত করতে থাকে। ১২৬টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে ইংল্যান্ডের ৭৬ জয় নিশ্চিতেও অবদান রাখেন তিনি। ছাড়িয়ে যান খোদ ভারতের মহেন্দ্র সিং ধোনিকেও।

মরগান স্রেফ দূরদর্শী অধিনায়ক ছিলেন না। খেলোয়াড় হিসেবেও তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। মিডল অর্ডারের হাল ধরাতে তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার! ২০০৯ সালে ইংল্যান্ডের জার্সিতে পথচলা শুরুর পর থেকেই কবজির জাদুকরী মুভমেন্টের সাহায্যে নান্দনিক সব শট খেলতেন মরগান। রিভার্স সুইপ আর ফ্লিক শটের কারিকুরিতে অনায়াসে বলকে পাঠিয়ে দিতেন সীমানার বাইরে।

বিশেষ করে, ম্যাচে যখন ওপরের দিকের ব্যাটাররা ব্যর্থ হওয়ায় মিডল অর্ডার দিশেহারা হয়ে পড়ত, তখনই কাণ্ডারি হয়ে উঠতেন তিনি। ধৈর্যশীল ব্যাটিং করে দলীয় ইনিংসকে লম্বা করা কিংবা ঝড় তুলে অনবদ্য ফিনিশারের ভূমিকায় আবির্ভূত হওয়া—কোনোকিছুতেই পিছিয়ে ছিলেন না এই বাঁহাতি ব্যাটার।

২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ৭১ বলে ১৪৮ রানের ক্যামিও ইনিংসটা সেটিরই দৃষ্টান্ত। সেদিন মাত্র ৫৭ বলে সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। পাশাপাশি, রেকর্ড ১৭টি ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের এক ইনিংসে সর্বাধিক ছক্কার বিশ্বরেকর্ডও গড়েন তিনি। মরগানের নেতৃত্বে সেবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইংল্যান্ড। এটিই দেশটির একমাত্র বিশ্বকাপ!

এখানেই শেষ নয়! এর আগে, মরগানের আগ্রাসী অধিনায়কত্বের জোরে ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে ইংলিশরা। ম্যাচটিতে কার্লোস ব্রেথওয়েট শেষ ওভারে টানা চারটি ছক্কা না হাঁকালে হয়ত শিরোপাটা উঠত মরগানের হাতেই!

এ ছাড়া, তাঁর তুমুল সাহসী মনোবলের কারণে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহেরও বিশ্বরেকর্ড গড়ে ইংল্যান্ড। ২০১৮ সালের জুনে নটিংহ্যামে দলটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছয় উইকেটে ৪৮১ রান সংগ্রহ করে। অ্যালেক্স হেলস ১৪৭ ও জনি বেয়ারস্টো ১৩৯ রানের বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন। মরগানও হাঁকান হাফ সেঞ্চুরি।

ঠিক দু’বছর আগে একই মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে রেকর্ড ৪৪৪ রান সংগ্রহের নজিরটিও থ্রি লায়ন্সদের দখলে ছিল। মরগানের নেতৃত্বে ১৩টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে রেকর্ড ১২টিতেই বিজয়ী হয় ইংল্যান্ড।

ইংল্যান্ডের জার্সিতে ২৪৮ ওয়ানডেতে ৭ হাজার ৭০১ এবং ১১৫ টি-টোয়েন্টিতে ২ হাজার ৪৫৮ রান করা এই তারকা দীর্ঘ ফর্মহীনতা আর ফিটনেসের ঝক্কির কারণে ২০২২ সালে ক্রিকেটকে বিদায় জানান। তবুও, ভয়ডরহীন ক্রিকেটীয় দর্শন ধারণের জন্য ইয়ন মরগানের নাম ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকতে বাধ্য!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link