এনসিএল কি বদলে দেবে বাংলাদেশের টেস্ট ভবিষ্যৎ?

এনসিএল আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের টেস্ট ক্রিকেটের মানগত দূরত্ব কমানোই দেশের নীতিনির্ধারকদের এখন মূল চ্যালেঞ্জ। নতুন মোড়কের এনসিএল কি পারবে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে লাল বলের অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করতে, নাকি আবারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে নতুন পদক্ষেপগুলো?

টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর জন্য প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট যে কতবড় আশীর্বাদ, তা ভারত কিংবা ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লাল বলে দেশ দুটির সাফল্যের মূল ভিত্তিই বলা চলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে।

এই ধারাবাহিকতায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও (বিসিবি) দেশের প্রথম শ্রেণির ন্যাশনাল ক্রিকেট লিগ তথা এনসিএলকে ঢেলে সাজাতে চাইছে সম্প্রতি। নতুন ঘরানার এই এনসিএল কি বাংলাদেশের টেস্ট ভবিষ্যতকে বদলে দেবে?

ঐতিহ্যগতভাবে, রঞ্জি ট্রফি আর কাউন্টি ক্রিকেট ভারত ও ইংল্যান্ড টেস্ট দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পাইপলাইন হিসেবে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে প্রথম শ্রেণির এই ঘরোয়া আসরগুলো থেকেই ইসিবি ও বিসিসিআই নিজেদের সেরা খেলোয়াড়দের তুলে আনছে।

রঞ্জি ট্রফিতে পাঁচ হাজার রান করা সরফরাজ খান এখন আলো ছড়াচ্ছেন ম্যান ইন ব্লুজদের জার্সিতে। যশস্বী জ্যাসওয়ালও ঘরোয়া গণ্ডির ব্যাটিং নৈপুণ্যকে টেনে নিয়ে গেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গণে। ৩১ টেস্ট খেলেই হাঁকিয়েছেন সাতটি সেঞ্চুরি। অন্যদিকে, কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত বোলিং কারিকুরি দেখানো গাস অ্যাটকিনসন আর শোয়েব বশিরও থ্রি লায়ন্সদের সাদা পোশাকে ধরে রেখেছেন পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা। এসব দৃষ্টান্তই প্রমাণ করে তাঁদের ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোর গুণগত মান কেমন।

বিপরীতে, এনসিএল কি বাংলাদেশের জাতীয় দলের পাইপলাইনে একইভাবে টেস্ট খেলোয়াড় সরবরাহ করতে পারছে? উত্তরে, সরাসরি হ্যাঁ বা না বলার তেমন ফুরসত অবশ্য নেই। চার দিনের এই টুর্নামেন্টটি দেশের টেস্ট ক্রিকেটারদের ছেঁকে বের করার মূল মঞ্চ হলেও, বাস্তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে এর দূরত্বটা ঢের। বিশ্বমানের অবকাঠামোর অভাব, অনুন্নত পিচ এবং বিপিএলের মতো লাভজনক সাদা বলের টুর্নামেন্টের প্রতি বাড়তি ঝোঁক দীর্ঘ পরিসরের লাল বলের সংস্কৃতিকে বেশ ক্ষুণ্ন করছে। এতে দীর্ঘ সংস্করণে ঘরোয়া পরিসরে মানসম্মত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে বলে মত ক্রিকেট বোদ্ধাদের।

ফলে ঘরোয়া এনসিএলে রান বা উইকেটের বন্যা ভাসালেও জাতীয় দলের কঠিন মঞ্চে এসে খেই হারিয়ে ফেলা খেলোয়াড়ের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এর সঙ্গে সিনিয়রদের লাল বলের নিয়মিত ম্যাচ এড়িয়ে চলার প্রবণতাও রূপান্তরকে কঠিন করে তোলে।

এতসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, এনসিএলে ১১২ উইকেট নিয়ে নজর কাড়া পেসার নাহিদ রানা গতির ঝড় তুলে জাতীয় দলের হয়ে টেস্টে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। তবে এনসিএলে ৬ হাজারের ওপর রান করা জাকির হাসান এখনও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি পুরোপুরি। বাংলাদেশের জার্সিতে ১৩ টেস্টে এখন পর্যন্ত একটি সেঞ্চুরি করেছেন এই ব্যাটার। অথচ, মুশফিকুর রহিম বা মুমিনুল হকের মতো অভিজ্ঞরা এনসিএলের এই প্রথাগত চার দিনের ম্যাচ খেলেই তাদের সাদা পোশাকে নিজেদের শক্ত ভিত গড়ে তুলেছেন।

সে যাইহোক, চলতি বছর টুর্নামেন্টটিতে বেশ বদল আনার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিসিবি। এরই মধ্যে, এনসিএলের প্রতিটি দলের অধিনায়কদের ঘটা করে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শুরুতেই আনা হয়েছে নতুন উন্মাদনা। ডিউকের বদলে কুকাবুরা বলে খেলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে এবার। আটটি বিভাগের জন্য থাকছে আটটি পৃথক ব্যাগি ক্যাপও। রাউন্ড-রবিন ফরম্যাটেই চলবে ম্যাচগুলো।

সবমিলিয়ে, এনসিএল আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের টেস্ট ক্রিকেটের মানগত দূরত্ব কমানোই দেশের নীতিনির্ধারকদের এখন মূল চ্যালেঞ্জ। নতুন মোড়কের এনসিএল কি পারবে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে লাল বলের অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করতে, নাকি আবারও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে নতুন পদক্ষেপগুলো?

 

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link