বড় গাছের নিচে পড়ে থাকা ছোট ছোট দুর্বাঘাসের খবর কজন রাখে? মাড়িয়ে চলে যায়, কিংবা মিশে যায় মাটির সাথে। তেমনই কিছু নাম এতটাই বড় হয়ে ওঠে যে, তার নিচে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়াটাকেই আর দেখা যায় না। ‘ম্যারাডোনা’ তেমনই এক নাম। যে নাম শুনলেই ফুটবলপ্রেমীর চোখে ভেসে ওঠে ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার ছবি। অথচ সেই কিংবদন্তির একই রক্ত, একই পদবি, একই ফুটবল-স্বপ্ন বয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন আরও একজন। হুগো ম্যারাডোনা। তার খবর ক’জন রাখে?
নিয়তি যেন শুরু থেকেই তার জন্য গল্পটা একটু অন্যভাবে লিখে রেখেছিল। ডিয়েগো যখন ফুটবলকে শিল্পে পরিণত করছেন, তখন হুগোও পায়ে বল তুলে নিয়েছিলেন। ডিয়েগো যখন আর্জেন্টিনার গলি থেকে উঠে এসে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চের আলো কুড়োচ্ছেন, হুগো তখন একই স্বপ্নের পেছনে ছুটছেন। পার্থক্য শুধু একটাই, হুগোর সামনে সবসময় একজনের ছায়া ছিল। সেই ছায়ার নাম ডিয়েগো।
১৯৬৯ সালে আর্জেন্টিনার লানুসে জন্ম হুগোর। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তিনি। ডাকনাম ‘এল তুরকো’। ফুটবলের হাতেখড়িও বড় ভাইয়ের পথেই, আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের একাডেমিতে। যে একাডেমি একসময় ডিয়েগোকে তুলে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের আকাশে, সেখানেই হুগোও শুরু করেছিলেন নিজের স্বপ্নের দৌড়।
হয়তো তখনও কেউ জানত না, এই ছেলেটিকে সারাজীবন নিজের ভাইয়ের নামের সাথে লড়াই করতে হবে। ১৯৮৫ সালে সেই লড়াইয়ে নিজের প্রথম বড় উত্তর দিয়েছিলেন হুগো। আর্জেন্টিনার অনূর্ধ্ব-১৬ দলের হয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচ। বুয়েনস আইরেসের মাঠে ৩-২ গোলের জয়। আর জয়সূচক গোলটি এসেছিল হুগোর পা থেকে। হুগো নিজের গল্পের প্রথম পাতায় সেটিই বড় এক স্বাক্ষর রাখেন।

দুই বছর পর আরও বড় স্বপ্ন। ডিয়েগোর সঙ্গে একই শহর, একই ক্লাব, একই জার্সিতে খেলবেন, এই আশায় হুগো চলে গেলেন নাপোলিতে। কিন্তু ফুটবল বড় নিষ্ঠুর এক শিল্পী। সব স্বপ্নকে পূর্ণতা দেয় না। নাপোলিতে গিয়েই ধারে চলে যেতে হলো আসকোলিতে।
তারপর ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭। রোমার বিপক্ষে সিরি ‘আ’-তে অভিষেক হুগোর। আর কিছুদিন পরই ফুটবল তাকে দাঁড় করিয়ে দিল ভাইয়ের ডিয়েগোর বিপক্ষে। একদিকে ডিয়েগো। অন্যদিকে হুগো। নাপোলি বনাম আসকোলি। ম্যাচ শেষ হলো ২-১-এ। জিতল ডিয়েগোর নাপোলি।
তবে একই বছর ঘটেছিল আরও বিরল এক ঘটনা। এক মাঠে তিন ম্যারাডোনা। ডিয়েগো, হুগো আর বড় ভাই লালো, গ্রানাদার হয়ে মালমোর বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে একসঙ্গে মাঠে নেমেছিলেন। ডিয়েগো গোল করলেন, লালোও গোল করলেন। গ্রানাদা জিতল ৩-২। সেদিন হয়তো কেউ ভাবেনি, কয়েক দশক পর এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে এক ফ্রেমে দাঁড়িয়ে থাকা তিন ভাই।
কিন্তু হুগোর গল্প কখনোই শুধু ডিয়েগোর গল্পের পাশের ফুটনোট ছিল না। স্পেন, অস্ট্রিয়া, ভেনেজুয়েলা, উরুগুয়ে, জাপান, কানাডা, ফুটবল তাকে ঘুরিয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। রায়ো ভায়েকানোর জার্সিতে খেলেছেন। দলটির লা লিগায় ওঠার পথের অংশ হয়েছেন। জাপানে কাটিয়েছেন নব্বইয়ের দশকের বড় সময়। পিজেএম ফিউচার্স, আভিসপা ফুকুওকা, কনসাদোলে সাপোরো, একেকটি ক্লাব তার ক্যারিয়ারের একেকটি অধ্যায়।

কিন্তু যত দূরেই যান, ‘ম্যারাডোনা’ নামটি তার সঙ্গে থেকেছে। এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। আবার সবচেয়ে বড় বোঝাও। মানুষ যখন হুগো ম্যারাডোনা বলেছে, তখন প্রথমেই ডিয়েগোকে খুঁজেছে। অথচ হুগোর নিজেরও ছিল ক্যারিয়ার। ছিল লড়াই। ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা।
১৯৯৯ সালে আর্জেন্টিনায় ফিরে খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টানলেন হুগো। কিন্তু ফুটবল তখনও তার কাছ থেকে বিদায় নেয়নি। কোচিংয়ে গেলেন। তৃণমূলের ফুটবলে জড়িয়ে পড়লেন। পরে নাপোলির কাছাকাছি বসতি গড়লেন, যে শহর ডিয়েগোকে ভালোবেসে নিজেদের একজন করে নিয়েছিল।
হয়তো জীবন তার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেয়নি। শুধু তাকে এমন এক পরিবারে জন্ম দিয়েছিল, যেখানে নিজের আলো খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে ডিয়েগো চলে গেলেন। ফুটবল হারাল তার এক মহারাজাকে। আর মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় পর, ২০২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর, হুগোর হৃদয়ও থেমে গেল। ইতালির মন্টে দি প্রোসিদায় নিজের বাড়িতে মাত্র ৫২ বছর বয়সে শেষ হলো তার পথচলা।
একই পদবি। একই রক্ত। একই ফুটবলের নেশা। কিন্তু গল্প দুটো এক নয়। ডিয়েগো ছিলেন পৃথিবীর জন্য ম্যারাডোনা। আর হুগো ছিলেন ম্যারাডোনা পরিবারের সেই মানুষটি, যিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছায়ার নিচে দাঁড়িয়েও নিজের মতো করে একটু আলো খুঁজেছিলেন। ম্যারাডোনা হয়েও তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ ছিল ম্যারাডোনাই।











