ভারস্যাটাইল ফুটবলের এক অখ্যাত ফিনিক্স!

আধুনিক ভারস্যাটাইল ফুটবলের আকাশে তিনি যেন এক ডানা মেলা অখ্যাত ফিনিক্স। তাঁর ক্রীড়ানৈপুণ্যে খোদ অলিম্পাস দেবতাও বিস্মিত না হয়ে পারেন না, অথচ তাঁকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতিও চোখে পড়ে না! তিনি স্প্যানিশ ফুটবলের দূত ডেভিড ভিয়া!

দলের প্রয়োজনে তিনিই খেলেন ফার্স্ট স্ট্রাইকার হিসেবে, আবার কখনো সরে যান লেফট উইংয়ে। আধুনিক ফরমেশন আর গেমপ্ল্যানের ভারস্যাটাইল ফুটবলের আকাশে তিনি যেন এক ডানা মেলা অখ্যাত ফিনিক্স। তাঁর ক্রীড়ানৈপুণ্যে খোদ অলিম্পাস দেবতাও বিস্মিত না হয়ে পারেন না, অথচ তাঁকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতিও চোখে পড়ে না! তিনি স্প্যানিশ ফুটবলের দূত ডেভিড ভিয়া!

ফুটবলে ভিয়ার শুরুটা মসৃণ ছিল না। ইনজুরি, অনিয়মিত পারফরম্যান্স আর সুযোগ না পাওয়ার সঙ্গে ব্যাপক লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে কিশোর বয়সে জন্মস্থানের ল্যাঙ্গরিও ক্লাবে খেলতে গিয়ে। অভিমানের বশে চোদ্দ বছর বয়সে ফুটবলও ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি একবার।

কিন্তু খনিতে কাজ করা বাবা হোসে ভিয়ার উৎসাহে মাঠে ফিরে যান তিনি। তাঁর ছেলেবেলায় আরও একটা ঘটনা ঘটে। মাত্র চার বছর বয়সে ফুটবল খেলতে গিয়ে ডান পায়ের ফিমার হাড় ভেঙে যায় তাঁর। সে সময়ে সিনিয়র ভিয়া ছেলেকে দিয়ে বাঁ পায়ে শট খেলানোর অভ্যাস করান। আর এটিই শাপে বর হয়ে ওঠে এই স্প্যানিয়ার্ড পরিণত হয়ে ওঠার পর। ভিয়ার দুই পায়েই সমানভাবে লক্ষ্যভেদে অনবদ্য কারিকুরি দেখানোর ভিত গড়ে ওঠে এভাবেই।

সে যাই হোক, পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থনে সবকিছু ছাপিয়ে সতেরো বছর বয়সে ভিয়া যোগ দেন মারেও ফুটবল স্কুলে। সেখানে ফুটবলীয় মেধার স্বাক্ষর রাখায় কিছুদিনের মধ্যেই উত্তর স্পেনের আস্তুরিয়া অঞ্চলের ক্লাবগুলোর নজরে আসেন তিনি।

অবশেষে ২০০০ সালে স্পোর্টিং গিজনে শুরু হয় ভিয়ার পেশাদার ফুটবলের যাত্রা। দুই মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে ৩৮ গোল করেন তিনি। যা অচিরেই স্পেনের টপ-ফ্লাইট লিগ লা লিগায় তাঁর অভিষেকের দুয়ার খুলে দেয়!

২০০৩ সালের গ্রীষ্মে প্রায় তিন মিলিয়ন ইউরোতে সদ্য লা লিগায় প্রমোটেড হওয়া রিয়াল জারাগোজায় নাম লেখান ভিয়া। দেশের শীর্ষ লিগে মানিয়ে নিতেও বেগ পেতে হয়নি তাঁকে। প্রথম মৌসুমেই ১৭ গোল করেন তিনি। ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল সেভিয়ার বিপক্ষে তিনি একাই চার গোল করে ৪-৪ ব্যধানে ম্যাচ ড্র করে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান।

তবে তাঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট আসে ২০০৪ সালের কোপা দেল রের ফাইনালে। ম্যাচটিতে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে অনবদ্য পারফরম্যান্স করে জারাগোজাকে শিরোপা জেতান তিনি, করেন একটি গোলও।

এরপরই প্রথম কোনো জারাগোজা খেলোয়াড় হিসেবে জাতীয় দলে ডাক পান ১৯৮১ সালে জন্মানো এই স্ট্রাইকার। জারাগোজা ভক্তরা তখন ‘ভিয়া ভিয়া, ম্যারাভিয়া ম্যারাভিয়া’ বলে তাঁকে অভিবাদন জানান। এর অর্থ হল – ভিয়া ভিয়া, মহান মহান!

তবে, জারাগোজার কাছে তখন ভিয়ার থেকেও টিম ম্যানেজমেন্টের জন্য টাকার দরকারটা ছিল বেশি। তাই ২০০৫-০৬ মৌসুমে লা লিগার প্রখ্যাত ক্লাব ভ্যালেন্সিয়ার কাছে ১২ মিলিয়ন ইউরোতে তাঁকে বিক্রি করে দেয় দলটি।

নতুন জায়গায় থিতু হতেও সময় লাগেনি তাঁর। ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে টানা পাঁচ মৌসুম সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার নজির গড়েন। এ সময়, প্রতিপক্ষের রক্ষণের গ্যাপ খুঁজে গোল করার এবং নিখুঁত ড্রিবলিংয়ের সামর্থ্য অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি, দলের প্রয়োজনে কখনো লেফট উইংয়ে সরে খেলা, কখনো কেন্দ্রীয় ফরোয়ার্ডের ভূমিকায় থাকা আবার কখনো প্লেমেকারের দায়িত্ব নিয়ে নিজেকে ভারস্যাটাইল করে তোলেন এই লা রোহা স্ট্রাইকার।

মৌসুমটিতে তাঁর অনবদ্য পারফরম্যান্সের বদৌলতে ভ্যালেন্সিয়া জায়ান্ট বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে জয় তুলে নেয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে ১৬৬ ম্যাচে ১০৮ গোল করেন ভিয়া।

ভ্যালেন্সিয়াতে থাকা অবস্থাতেই স্পেন জাতীয় দলের সোনালি ইতিহাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ট্রাম্পকার্ড বনে যান এই তারকা। অথচ, স্প্যানিশ ফুটবলে তখন রিয়াল-বার্সার বড় বড় তারকাদের জয় জয়কার! এরপরও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দলের জয়ের মূল ভিত গড়ে দিতে বুমেরাং হয়ে ওঠেন ভিয়া। দুই পায়েই সমানতালে গোল করায় সিদ্ধহস্ত এই স্ট্রাইকারের বিশেষত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে এখানেই!

ইউরো ২০০৮ জয় দিয়ে শুরু হয় স্পেন ফুটবলের নতুন যুগের। টুর্নামেন্টটিতে ডেভিড ভিয়া চার গোল করে গোল্ডেন বুট জিতে নেন। আসরজুড়ে ফার্নান্দো তোরেসের সাথে তাঁর অনবদ্য রসায়ন লা রোহা সমর্থকদের দারুণভাবে দোলা দেয়!

কিন্তু ভিয়া যে ভারস্যাটাইল ফুটবলের আকাশে ডানা মেলা এক প্রতিভাবান ফিনিক্স পাখি, তা বিশ্ব জানতে পারে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। ২০১০ সালের সেই আসরের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বাজেভাবে শুরু হয় স্পেনের বিশ্বকাপ যাত্রা। ম্যাচটিতে প্রধান স্ট্রাইকারের দায়িত্বে থাকলেও তেমন সুবিধা করতে পারেননি তিনি।

কিন্তু পরের ম্যাচ থেকে স্পেনকে একাই টেনে তোলেন ভিয়া। দলের প্রয়োজনে বাঁ উইংয়ে সরে গেলেও তিনি হন্ডুরাসের বিপক্ষে করেন জোড়া গোল। এরপর চিলি, পর্তুগাল আর প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তাঁর করা জয়সূচক গোলেই জয় পায় স্পেন।

পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের করা আটটি গোলের মধ্যে পাঁচটিই ছিল তাঁর। সেমিফাইনাল আর ফাইনালে লক্ষ্যভেদ না করলেও আক্রমণ গড়ায় ভিয়ার দুর্দান্ত কারিকুরিতে স্পেন নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়। ভিয়া জেতেন সিলভার বুট আর ব্রোঞ্জ বল।

২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ তিন বিশ্বকাপেই স্পেনের হয়ে গোল পাওয়া ভিয়া আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে, সংখ্যার মাপে ৯৮ ম্যাচে ৫৩ গোল।

বিশ্বকাপ ও ইউরোতে দ্যুতি ছড়িয়ে ২০১০ সালে ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে স্প্যানিশ জায়ান্ট বার্সেলোনায় যোগ দেন ভিয়া। কাতালানদের হয়ে তিন বছর জেতেন দুটি লা লিগা ও ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। তবে, ক্লাবটিতে তারকাদের ভিড়ে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরতে পারেননি তিনি। ৭৭ ম্যাচে ৩৩ গোল করেন তিনি বার্সার জার্সিতে।

এরপর ২০১৩ সালে এক মৌসুমের জন্য অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে যোগ দেন। সাদ-লাল শিবিরের হয়েও লা লিগা টাইটেল জয়ের স্বাদ পান ভিয়া। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে মেজর লিগ সকারের নিউ ইয়র্ক সিটিতে পাড়ি জমান ভিয়া। ক্লাবটিতে ১১৭ ম্যাচে ৭৭ বার জালের ঠিকানা খুঁজে নেন তিনি। অবশেষে ২০২০ সালে জাপানের ভিসেল কোবের হয়ে খেলে অত্যন্ত সন্তর্পণেই ১৯ বছরের এক উজ্জ্বল ক্যারিয়ারের যবনিকা ঘটান ভিয়া।

হাল আমলের প্রথাগত ফুটবলারদের মতো খ্যাতি বা অতিমানবীয় ট্রেন্ডের পেছনে ছোটার প্রবণতা কখনোই ছিল না ভিয়ার মাঝে। অথচ, প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের সামনে ডেভিড ভিয়া ছিলেন এক নিখুঁত গোলশিকারি। বলের লাইন পড়া আর গ্যাপ খুঁজে বের করায় তাঁর চেয়ে কোন স্প্যানিশ স্ট্রাইকার আর এত দক্ষ হতে পারবেন? কে জানে, স্বপ্নের এই নীরব রূপকারকে ছাড়া স্পেনের বিশ্বজয়ই হয়তো আজো এক অধরা স্বপ্ন হয়েই থাকত!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link