থমাস মুলার: ফুটবলের এক নান্দনিক শিল্পী

ফুটবলে সেরা হতে অলৌকিক শারীরিক ক্ষমতার চেয়ে অনবদ্য পজিশনিং সেন্স, সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তা ও সময়জ্ঞানের নিখুঁত প্রয়োগ কেন জরুরি, তা ফুটবল বোদ্ধাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন থমাস মুলার। ভারস্যাটাইল ফুটবলের নান্দনিক এক শিল্পী হিসেবে ফুটবলপ্রেমীরা তাই যুগ যুগ ধরে তাঁকে ঠাঁই দেবেন হৃদয়ের মণিকোঠায়!

তিনি ড্রিবলিংয়ে দ্যুতি ছড়ান না। দেখান না ঝোড়ো স্প্রিন্টের কারিকুরিও। তবু নিখাদ বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার সাহায্যে তিনি ফুটবল দুনিয়ায় গড়েছেন নিজের স্বকীয় সাম্রাজ্য! তিনি আর কেউ নন, জার্মান ফরোয়ার্ড থমাস মুলার।

প্রথাগত কিংবদন্তি লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো মুলারের খেলার নান্দনিকতা খালি চোখে ধরা পড়ে না কখনোই। কার্যকর ফুটবল খেলার নিপুণ কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান না রাখলে, আপনি বুঝতেই পারবেন না কেন মুলার অন্যদের চেয়ে আলাদা!

আজীবন মুলার নিজেকে কোনো একক পজিশনের খেলোয়াড় হিসেবে তুলে ধরতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছেন। কারণ, তাঁর কাছে ফুটবলের সবুজ গালিচাটা হলো বিশালাকার দাবা বোর্ডের মতো। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, উইঙ্গার কিংবা স্ট্রাইকার—পজিশন যা-ই হোক, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের গ্যাপ খুঁজে বের করে মিলি সেকেন্ডের মধ্যে গোলের সুযোগ তৈরির দায়িত্বটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড়। এটাকেই তিনি আখ্যা দেন “রাউমডাউটার” স্টাইল বলে!

২০০৭ সালে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখের যুব দলে মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও মূল দলে অভিষেকের পর তিনি ব্যাভারিয়ানদের আক্রমণভাগের প্রাণভোমরায় পরিণত হন। নিখুঁত পজিশনিং সেন্স, হাই-ইনটেনসিটি প্রেসিং আর অনবদ্য ফিনিশিংয়ের অসামান্য দক্ষতা অর্জন করে ক্রমেই স্টারডমের সূত্রপাত ঘটান দলের ভেতরে।

অহম বিসর্জন দিয়ে সবসময় দলকে সবার ওপরে রেখে দ্রুত পাস-অ্যান্ড-মুভ কৌশলে প্রতিপক্ষের শক্ত রক্ষণব্যূহ মুহূর্তেই ভেঙে ফেলতে তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার! ক্রীড়া সাংবাদিক উলি হেস তাই বলেন, ‘ড্রিবলিং বা গতি দিয়ে মুলার আপনাকে হারাবেন না, তিনি স্রেফ আপনাকে হারিয়ে দেবেন। কিভাবে হারাবেন আপনি বুঝতেও পারবেন না!’

বায়ার্ন মিউনিখের ইতিহাসের বড় আইকন মুলার জিতেছেন রেকর্ড ১২টি বুন্দেসলিগা শিরোপা। এছাড়া ২০১২-১৩ ও ২০১৯-২০ মৌসুমে দুটি ট্রেবল জয়ের পাশাপাশি অর্জন করেছেন দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি। বুন্দেসলিগার ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট করার নজিরও এই ভারস্যাটাইল ফুটবলারের দখলে। বায়ার্নের হয়ে ছয়টি ডিএফবি-পোকাল ও আটটি সুপারকাপের পর ভ্যাঙ্কুভারের হয়ে কানাডিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেও ট্রফি সংগ্রাহকের ধারা বজায় রেখেছেন ৩৬ বছর বয়সী এই তারকা।

জার্মানির জাতীয় দলের জার্সিতেও মুলার লিখেছেন এক অনন্য মহাকাব্য। ২০১০ ফিফা বিশ্বকাপে ডাক পেয়েই মাত্র বিশ বছর বয়সে পাঁচ গোল ও তিন অ্যাসিস্ট করে জিতে নেন গোল্ডেন বুট ও সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার।

পরের আসরেও পাঁচটি গোল করে জার্মানিকে বিশ্বসেরা করার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ১৯৮৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ওবারবায়ার্নের উইলহেমে জন্মানো এই তারকা। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ১৩১ ম্যাচে ৪৫টি গোল করেন মুলার। ২০২৪ ইউরো শেষে জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর আগে ৩৫টি ট্রফি জিতে ইতিহাসের অন্যতম সফল জার্মান ফুটবলার হয়ে ওঠেন তিনি।

ফুটবলে সেরা হতে অলৌকিক শারীরিক ক্ষমতার চেয়ে অনবদ্য পজিশনিং সেন্স, সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তা ও সময়জ্ঞানের নিখুঁত প্রয়োগ কেন জরুরি, তা ফুটবল বোদ্ধাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন থমাস মুলার। ভারস্যাটাইল ফুটবলের নান্দনিক এক শিল্পী হিসেবে ফুটবলপ্রেমীরা তাই যুগ যুগ ধরে তাঁকে ঠাঁই দেবেন হৃদয়ের মণিকোঠায়!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link