ঘরোয়া ক্রিকেটের রং হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ আমাদের দেশে নতুন নয়। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল নিজেই সেটা মেনে নিয়ে বলেছেন, ” আমরা প্রায়ই শুনেছি, ঘরোয়া ক্রিকেটের রং হারিয়ে গেছে, কোনো আগ্রহ নেই, কেউ কেউ তো একে পিকনিক ক্রিকেটও বলেন।” সেই রং ফেরানোর চেষ্টা থেকেই ২৭ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হয়েছে ডোমেস্টিক থ্রি ট্রফি, সংক্ষেপে ডি-থ্রি। সঙ্গে বোর্ড এমন একটা ভাবনাও সামনে এনেছে, যা বাংলাদেশের ক্রিকেট আয়োজনের চেহারা বদলে দিতে পারে। ভারত আর ইংল্যান্ডের পথ ধরে ভেন্যু ঠিক হবে বিডিংয়ের মাধ্যমে।
টি-টোয়েন্টি, একদিনের আর চার দিনের ম্যাচ, তিনটি সংস্করণ এখন থেকে একসঙ্গে একই টুর্নামেন্টের ছাতার নিচে খেলা হবে। এনসিএলের টি-টোয়েন্টি আর বিসিএলের চার দিন ও ওয়ানডে ঢুকছে এই কাঠামোতে, আর এনসিএলের চার দিনের সংস্করণ আগের মতোই আলাদা থাকছে।
ছয়টি প্রতিষ্ঠান তিন বছরের চুক্তিতে দলের মালিকানা নিয়েছে, এইচ ব্লু স্টার, ওয়ালটন গ্রুপ, সিটিজেন ব্যাংক, অ্যাকমি গ্রুপ, সেভেন রিংস সিমেন্ট ও ফরচুন গ্রুপ। প্রতিটি দল তিন সংস্করণ মিলিয়ে নিলাম থেকে সর্বোচ্চ ২৩ জন খেলোয়াড় নিতে পারবে। কোচিং স্টাফ, অ্যানালিস্ট, ফিজিও আর ট্রেইনারদের ড্রাফট হয়ে গেছে, খেলোয়াড়দের ড্রাফট হওয়ার কথা এই মাসেই।

টুর্নামেন্ট শুরু হবে ১৫ ডিসেম্বর, সংস্কার শেষে ফিরে আসা বরিশালের জীবনানন্দ দাস ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি দিয়ে। চার দিনের ম্যাচ হবে জানুয়ারিতে, ৫০ ওভারের লড়াই মে মাসে। ভেন্যু হিসেবে আপাতত ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম আর বরিশালের বাইরে ভাবছে না বোর্ড। খুলনা পরিকল্পনায় আছে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে খেলা আয়োজন কঠিন।
ইংল্যান্ডে আগামী পাঁচ-সাত বছরে কোন মাঠে টেস্ট, ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি হবে, তা ঠিক হয় কাউন্টি ক্লাবগুলোর দরপত্রের ভিত্তিতে। মাঠের সুযোগ-সুবিধা, আয়োজনের সামর্থ্য সব তুলে ধরে ক্লাবগুলো ইসিবির কাছে আবেদন করে। ভারতে সারা দেশে খেলা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিসিসিআই চালু করেছে রোটেশন পলিসি। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি মাঠে টেস্ট খেলেছে ভারত, সংখ্যাটা বিশের ওপরে। অস্ট্রেলিয়ায় এই সংখ্যা আট থেকে দশ, ইংল্যান্ডে সাত-আটটি। বাংলাদেশে এমন কোনো ব্যবস্থা এখনো নেই, তাই বিসিবি ভাবছে ডি-থ্রি দিয়েই বিডিং প্রক্রিয়ার শুরুটা করা যায় কি না।
এনসিএল চলাকালীন বোর্ড পরিচালক শাহনিয়ান তানিম সেই ইঙ্গিতই দিলেন। তাঁর কথায়, “আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেকটা ভেন্যুকে এখন চ্যালেঞ্জের মুখে ছেড়ে দিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে মনে হয় খুলনা যদি ইভেন্টটা আয়োজন করতে চায়, তাহলে খুলনার উচিত বিসিবির কাছে গিয়ে বলা, আমি এটার জন্য বিড করতে চাই।” কক্সবাজারের নামও নিয়ে তিনি একই কথা বলেন। শেষে নিশ্চয়তা দেন, “আমি একটা জিনিস নিশ্চিত করে বলতে পারি, বিসিবি খুব সতর্ক থাকবে এবং যে যোগ্য, দরপত্র তাকেই দেওয়া হবে।” বোর্ডের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, ক্রিকেটকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া, আর মাঠ আয়োজকদের মধ্যে একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করা।

এবারের মৌসুমে ঘরোয়া ক্রিকেটে যোগ হয়েছে আরেকটি নতুন স্তর। ৩ অক্টোবর এনসিএল দিয়ে মৌসুম শুরু হয়েছে, আর ৭ অক্টোবর থেকে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে এনসিএল সেকেন্ড ইলেভেন চ্যাম্পিয়নশিপ। আট বিভাগীয় দল, রংপুর, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহী, লিগ পর্বে সাতটি করে ম্যাচ খেলবে। সেরা দুই দল ১১ থেকে ১৩ নভেম্বর জামালপুর জেলা স্টেডিয়ামে ফাইনালে মুখোমুখি হবে।
ইংল্যান্ডের কাউন্টি ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই এই উদ্যোগ। তামিম আগেই বলেছিলেন, আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিভাগ থেকে জাতীয় দলে উঠে আসার উদাহরণ খুবই কম, কারণ সেই মঞ্চটাই আমরা কখনো তৈরি করতে পারিনি, এবার সেই মঞ্চ তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় দলের পাইপলাইন ভরাট রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় ঘরোয়া ক্রিকেটকে মজবুত করা। ফ্র্যাঞ্চাইজি কাঠামো, তিন সংস্করণের নিয়মিত খেলা, সেকেন্ড ইলেভেন আর ভেন্যু নিয়ে প্রতিযোগিতা, সব মিলিয়ে একজন তরুণ ক্রিকেটার বছরজুড়ে মানসম্পন্ন ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন। সেই সুযোগ থেকেই উঠে আসবেন বিশ্বমানের খেলোয়াড়েরা। ভারত আর ইংল্যান্ড যে পথে হেঁটে নিজেদের ক্রিকেটকে এত গভীর করেছে, বিসিবিও সেই পথেই পা বাড়াল। ফল পেতে সময় লাগবে, তবে দিকটা ঠিক বলেই মনে হচ্ছে।











