বড় কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের নিলাম বা ড্রাফটের পর বাংলাদেশে একটা চেনা হাহাকার শোনা যায়, বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা দল পান না। কখনো এক-দুজন পান, বাকিরা অবিক্রিতই থেকে যান। সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ ৭ অক্টোবরের এসএ টোয়েন্টি নিলাম। ১৫৬ জনের চূড়ান্ত তালিকায় বাংলাদেশি ছিলেন একজনই, নাহিদ রানা, আর তিনি দল পাননি। এর কয়েকদিন আগে আইএলটি২০ নিলামেও কোনো বাংলাদেশি দল পাননি।
এসএ টুয়েন্টি তে বাংলাদেশের প্রতিনিধি থাকছেন একমাত্র রিশাদ, তাও নিলামের আগে আগস্টেই তাঁকে সরাসরি সই করিয়ে রেখেছে সানরাইজার্স ইস্টার্ন কেপ। এ বছরের আইপিএল নিলামে সাতজন বাংলাদেশি তালিকায় ছিলেন, দল পেয়েছেন শুধু মুস্তাফিজ। কলকাতা নাইট রাইডার্স তাঁকে নিয়েছিল ৯ দশমিক ২ কোটি রুপিতে, যদিও পরে বিসিসিআইয়ের অনুরোধে তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়।
দ্য হান্ড্রেডের নিলামে নিবন্ধন করেছিলেন ২৩ জন, চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা পান মাত্র দুজন, মুস্তাফিজ আর রিশাদ। মুস্তাফিজ গেছেন বার্মিংহাম ফিনিক্সে, রিশাদ অবিক্রিত। বাংলাদেশিদের জায়গা মেলে মূলত এলপিএল, নেপাল প্রিমিয়ার লিগ বা পিএসএলের মতো লিগে। বড় মঞ্চগুলোতে বাংলাদেশি ক্রিকেটারের গুরুত্ব তাই প্রায় নেই বললেই চলে।

একসময় ছবিটা অন্যরকম ছিল। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের বড় নাম ছিলেন সাকিব আল হাসান, তাঁকে পাওয়ার জন্য বড় বড় দল মুখিয়ে থাকত। দেশের জার্সিতে নিয়মিত না থাকলেও তিনি এখনো নানা লিগে খেলছেন, কিন্তু সেই ঘিরে ধরার দিন আর নেই।
এখন মুস্তাফিজ মাঝেমধ্যে সুযোগ পাচ্ছেন, রিশাদকে কিছু দল নিচ্ছে। এসএ টোয়েন্টিতে সানরাইজার্স, বিগ ব্যাশে হোবার্ট হারিকেনস আর পিএসএলে রাওয়ালপিন্ডিজ তার উদাহরণ। এর বাইরে কাউকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। কেন এই পার্থক্য, কেন বাংলাদেশি খেলোয়াড়েরা বারবার অবিক্রিত থেকে যান?
এর একটা বড় কারণ গত এক দশকে ক্রিকেটের চরিত্র বদলে যাওয়া। আগে ম্যাচ পারফর্মারের অনেক দাম ছিল। এখন সবাই খোঁজে ম্যাচ উইনার। প্রতিটি দল চায় এগারো জনই ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য নিয়ে নামুক, যাতে একজন ব্যর্থ হলে আরেকজন দায়িত্ব নিয়ে দলকে টেনে নিতে পারে। এই জায়গাতেই আমরা পিছিয়ে, আর বাংলাদেশ দলের পরিসংখ্যান দেখলেই সেটা বোঝা যায়।

ভারতের দিকে তাকালে পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হয়। বছরের পর বছর আইপিএল থেকে খেলোয়াড় তুলে আনা এই দলে যেদিন অভিশেক শর্মা বা সুরিয়াভানসি রান পান না, সেদিন শ্রেয়াস আইয়ার কিংবা ঈশান কিষাণ এগিয়ে আসেন। তাঁরাও ব্যর্থ হলে অক্ষর প্যাটেল বা শিভাম দুবে ম্যাচ বের করে নেন। কেউ না কেউ জিতিয়ে যান, ম্যাচ উইনারের আসল বৈশিষ্ট্য এটাই। আমরা ঠিক এখানেই পিছিয়ে আছি, তাই আমাদের খেলোয়াড়দের দলে নিতে কেউ তেমন আগ্রহ দেখায় না।
তাহলে মুস্তাফিজ আর রিশাদ কেন দল পাচ্ছেন? উত্তর তাঁদের নিজস্ব বিশেষত্বে। পুরো বিশ্বেই লেগ স্পিনারের আলাদা কদর আছে, কারণ একজন লেগ স্পিনার যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের রং বদলে দিতে পারেন। স্পেশালিস্ট লেগ স্পিনারের সংখ্যাও কম, আর সেখানেই চলে রিশাদের জাদু। মুস্তাফিজ আবার বিশ্বের নামকরা ডেথ ওভার স্পেশালিস্ট। শেষ ওভারগুলোতে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সব বোলারের থাকে না, এই বিশেষ গুণের জন্যই তাঁর চাহিদা ছিল, আর কোথাও কোথাও এখনো আছে।
তাই প্রতিবার নিলামের পর হাহাকার করার চেয়ে বেশি জরুরি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বোঝা, বাজারের চাহিদাটা ধরতে পারা। সেটা পারলে খেলোয়াড়দের আর দল খুঁজে বেড়াতে হবে না। বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোই নিজেদের সূচি মিলিয়ে তাঁদের দলে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকবে।











