ষাট বছর ধরে আক্ষেপের একই বৃত্তে ইংল্যান্ড!

১৯৬৬ সালের এক গৌরবময় বিকেল। ওয়েম্বলিতে নিজেদের মাটিতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে ইংল্যান্ড। অধিনায়ক ববি মুরের হাতে ট্রফি ওঠার সেই দৃশ্য আজও ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। কিন্তু সেই সাফল্যের পর থেকেই যেন শুরু হয় দীর্ঘ এক আক্ষেপের যাত্রা, যা আজও চলমান।

১৯৬৬ সালের এক গৌরবময় বিকেল। ওয়েম্বলিতে নিজেদের মাটিতে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে ইংল্যান্ড। অধিনায়ক ববি মুরের হাতে ট্রফি ওঠার সেই দৃশ্য আজও ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। কিন্তু সেই সাফল্যের পর থেকেই যেন শুরু হয় দীর্ঘ এক আক্ষেপের যাত্রা, যা আজও চলমান।

চার বছর পর মেক্সিকোয় সেই আক্ষেপের প্রথম অধ্যায় লেখা হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে দুই গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হয়নি ইংল্যান্ডের। গোলরক্ষক পিটার বনেট্টির একাধিক ভুল আর অসুস্থতার কারণে অধিনায়ক ববি চার্লটনকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়। জার্মানরা সমতা টেনে ম্যাচ নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় ইংলিশরা।

এরপর দীর্ঘদিন বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে তেমন সুবিধা করতে পারেনি ইংল্যান্ড। ১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপে অদ্ভুত এক ফরম্যাটের শিকার হয় তারা। অপরাজিত থেকেও দ্বিতীয় রাউন্ডে ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি ও স্বাগতিক স্পেনের সঙ্গে এক গ্রুপে পড়ে তিনটি ম্যাচেই ড্র করে বসে ইংলিশরা, ফলে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিদায় নিতে হয় সেমিফাইনালে ওঠার আগেই।

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে আসে আরও এক নাটকীয় হার। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই কুখ্যাত হাত দিয়ে করা গোল—যা ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত—ইংলিশদের স্বপ্নভঙ্গ করে দেয়। এরপর ম্যারাডোনার আরেকটি অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের গোলে ২-০ ব্যবধানে হেরে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড।

১৯৯০ সালে ইতালিতে আবার একটু আশার আলো দেখা যায়। সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছায় ইংলিশরা। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেই ম্যাচে ১-১ সমতায় থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন মিডফিল্ডার পল গ্যাসকোয়েন, যার কান্নাভেজা মুখ পরিণত হয় সেই বিশ্বকাপের প্রতীকী দৃশ্যে। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে হেরে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড।

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার কাছেই থমকে যায় ইংলিশদের যাত্রা। শেষ ষোলোর ম্যাচে তরুণ ডেভিড বেকহ্যাম প্রতিপক্ষ ডিয়েগো সিমিওনেকে বাজেভাবে ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন, ফলে দশজনের দল নিয়ে খেলতে হয় ইংল্যান্ডকে। ম্যাচ শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে গড়ালে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় তারা।

২০০২ সালে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড। মাইকেল ওয়েনের গোলে প্রথমে এগিয়ে গেলেও রোনালদিনহোর অসাধারণ এক ফ্রি-কিক গোল আর রিভালদোর নৈপুণ্যে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয় ব্রাজিল, শেষ পর্যন্ত সেই আসরের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে এগিয়ে যায় তারা।

২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, স্টিভেন জেরার্ড, জন টেরি ও ওয়েন রুনিদের নিয়ে গড়া দলটিকে ঘিরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে হেরে আবারও খালি হাতে ফিরতে হয় ইংলিশদের।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় জার্মানির বিপক্ষে ঘটে বিতর্কিত এক ঘটনা। ১-১ সমতায় থাকা অবস্থায় ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের একটি শট ক্রসবারে লেগে গোললাইন পেরিয়ে গেলেও রেফারি তা গোল হিসেবে দেননি। এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই অবিচার বলে মনে করেন। এরপর জার্মানির আক্রমণের ঝড়ে ৪-১ ব্যবধানে বড় হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইংল্যান্ড।

২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে আসে সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়টি। গ্রুপ পর্বে প্রথম দুই ম্যাচেই ইতালি ও উরুগুয়ের কাছে হেরে যায় ইংল্যান্ড, ফলে ১৯৫৮ সালের পর এই প্রথম গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের।

দীর্ঘ হতাশার পর গ্যারেথ সাউথগেটের অধীনে ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে নতুন আশা জাগে ইংলিশ সমর্থকদের মনে। ২৮ বছর পর সেমিফাইনালে পৌঁছায় দলটি। কিন্তু সেই আসরের চমক ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে আবারও ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষেও একই রকম আক্ষেপের গল্প লেখা হয়। ম্যাচের শেষ দিকে পেনাল্টি পেয়েও তা মিস করেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন, যা ইংল্যান্ডের বিদায়কে আরও বেদনাদায়ক করে তোলে।

আর এবার, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আটলান্টায় সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়ে আরও একবার একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখল ইংল্যান্ড। অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর জয় ধরে রাখতে রক্ষণাত্মক কৌশলে চলে যান কোচ টমাস টুখেল। কিন্তু লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ম্যাচের শেষ দিকে ঝড় তোলে, এনজো ফের্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে জায়গা করে নেয় তারা।

ষাট বছর ধরে একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে ইংলিশ ফুটবল—প্রতিটি আসরেই আশা জাগে, লড়াই হয়, আর শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়ে স্বপ্নের প্রাসাদ। এই আক্ষেপের চক্র থেকে কি আদৌ কখনো মুক্তি মিলবে থ্রি লায়ন্সদের?

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link