খেলার মাঠে কত ধরনের আউটই তো দেখা যায় – বোল্ড, কট, রানআউট, স্টাম্পড বা এলবিডব্লিউ। কিন্তু ক্রিকেটের দীর্ঘ ১৪৫ বছরের বেশি আন্তর্জাতিক ইতিহাসে কখনো কোনো ব্যাটারকে ‘টাইমড আউট’ বা সময়মতো ক্রিজে পৌঁছাতে না পারার কারণে মাঠ ছাড়তে হয়নি। ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে সেই নজিরবিহীন ঘটনাই ঘটেছিল।
বিশ্বকাপের সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ। যে জিতবে, সে-ই ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির টিকিট কাটবে। ইনিংসের তখন ২৫তম ওভার চলছে। সাকিব আল হাসানের বলে সাদিরা সমরাবিক্রমা আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরলেন। নিয়ম অনুযায়ী নতুন ব্যাটার হিসেবে মাঠে নামার কথা অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের।
ম্যাথুস ঠিকই মাঠে প্রবেশ করেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তাঁর হেলমেট নিয়ে। মাঠে এসে তিনি খেয়াল করেন, তাঁর হেলমেটের স্ট্র্যাপ বা ফিতাটি ছেঁড়া। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ডাগআউটে ইশারা করেন আরেকটি হেলমেট আনার জন্য।

ঠিক এই মুহূর্তেই ঘটে মোড় ঘোরানো ঘটনা। নিয়ম অনুযায়ী, উইকেটের পতন ঘটার পর নতুন ব্যাটারকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্রিজে এসে বল মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এই সময়সীমা হলো দুই মিনিট।
বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও ফিল্ডাররা আম্পায়ারের কাছে নিয়ম অনুযায়ী ‘টাইমড আউট’ এর আবেদন করেন। অন-ফিল্ড আম্পায়ার মারাইজ ইরাসমাস ও রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ নিয়মের কিতাব ঘেঁটে দেখেন নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেছে। সাকিবকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি তাঁর আপিল প্রত্যাহার করতে রাজি হননি। ফলে আম্পায়াররা বাধ্য হয়ে ম্যাথুসকে টাইমড আউট ঘোষণা করেন।
আম্পায়ারের আঙুল তোলার সঙ্গে সঙ্গেই হতাশা ও ক্ষোভে ফেড়ে পড়েন অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস। তিনি আম্পায়ারদের কাছে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে হেলমেটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাঁর এই বিলম্ব হয়েছে, যা কোনো সময় অপচয় করার উদ্দেশ্যে ছিল না। কিন্তু নিয়মের বাধ্যবাধকতার কারণে আম্পায়াররা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

ক্ষুব্ধ ম্যাথুস কোনো বল না খেলেই মাঠ ছেড়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। ফেরার পথে ক্ষোভে হেলমেট মাটিতে ছুড়ে ফেলেন তিনি। এই ঘটনায় স্টেডিয়ামের দর্শক থেকে শুরু করে ধারাভাষ্যকার ও ক্রিকেটবোদ্ধারাও হতবাক হয়ে যান।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে ঝড় ওঠে। ক্রিকেট অনুরাগীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এক পক্ষের মতে, লঙ্কান ব্যাটার নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুত হতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং বাংলাদেশ দল ক্রিকেট আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ বৈধ আবেদনই করেছে। এটি ছিল গেম এওয়ারনেসের একটি সূক্ষ্ম প্রয়োগ। অন্যপক্ষের মতে, হেলমেটের মতো একটি সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের ত্রুটির কারণে কোনো ব্যাটারকে এভাবে আউট করা ‘স্পিরিট অব ক্রিকেট’ বা খেলাধুলার মূল চেতনার পরিপন্থী।
ক্রিকেট মাঠে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের এই ‘টাইমড আউট’ রেকর্ড। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রথম ব্যাটার হিসেবে তাঁর এই অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন ক্ষত হয়ে এবং এক নতুন বিতর্কের নজির হয়ে বেঁচে থাকবে।












