বাতিগোল, রক্ত-মাংসের এক গোলমেশিন

যার একেকটি শট ছিল গোলপোস্টের জালে আছড়ে পড়া বজ্রপাত। নব্বইয়ের দশকের অতি-কৌশলী ইতালিয়ান ডিফেন্স যখন ফুটবলকে বোতলবন্দি করে ফেলেছিল, তখন এই আর্জেন্টাইন সেনাপতি মাঠে নামতেন এক রুদ্ররূপ নিয়ে।

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা – ফুটবল ইতিহাসের সেই আদিম ও অদম্য গোলমেশিন। যার একেকটি শট ছিল গোলপোস্টের জালে আছড়ে পড়া বজ্রপাত। নব্বইয়ের দশকের অতি-কৌশলী ইতালিয়ান ডিফেন্স যখন ফুটবলকে বোতলবন্দি করে ফেলেছিল, তখন এই আর্জেন্টাইন সেনাপতি মাঠে নামতেন এক রুদ্ররূপ নিয়ে।

বাতিস্তুতার ফুটবল কোনো আলতো ছোঁয়া বা জ্যামিতিক নিখুঁত পাসের গল্প ছিল না। তার খেলা ছিল শক্তি, গতি আর তীব্র আবেগের এক আদিম প্রকাশ। পেনাল্টি বক্সের যেকোনো কোণ থেকে, যেকোনো দূরত্ব থেকে যখন তিনি শট নিতেন, তখন মনে হতো বলটি বুঝি গোলপোস্টের জাল ছিঁড়ে মহাবিশ্বের কোনো অনন্ত শূন্যতায় হারিয়ে যাবে।

বাতিস্তুতার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুন্দর এবং একই সাথে বেদনাবিধুর অধ্যায় জুড়ে আছে ফ্লোরেন্সের ক্লাব ফিওরেন্তিনা। ১৯৯৩ সালে যখন ক্লাবটি রেলিগেশনের কবলে পড়ে দ্বিতীয় বিভাগে নেমে যায়, সমসাময়িক যেকোনো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার হলে ক্লাব ছেড়ে চলে যেতেন। কিন্তু বাতিস্তুতা ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তিনি ফ্লোরেন্সেই থেকে গেলেন, ক্লাবকে টেনে তুললেন প্রথম বিভাগে।

​ফ্লোরেন্সের মানুষ তাকে ভালোবেসেছিল ঈশ্বরের মতো। স্তাদিও আর্তেমিও ফ্রাঙ্কির বাইরে বসেছিল তার ব্রোঞ্জের মূর্তি। অথচ এই অতিমানবীয় ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক চরম একাকীত্ব। ফিওরেন্তিনাকে ভালোবেসে ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা ট্রফিহীন কাটিয়ে দেওয়ার পর, ২০০০ সালে যখন তিনি এএস রোমায় যোগ দিলেন, তখন ফ্লোরেন্স কেঁদেছিল।

​পরের মৌসুমেই রোমার জার্সিতে নিজের প্রিয় ফিওরেন্তিনার জালে বল পাঠিয়েছিলেন বাতিস্তুতা। গোলটি করার পর পুরো স্টেডিয়াম যখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে, বাতিস্তুতা তখন দুই হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন। ফুটবলের ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল। গোল করে কোনো স্ট্রাইকার এভাবে অনুশোচনায় পুড়ছেন! ওটা কোনো বেইমানি ছিল না, ওটা ছিল এক পেশাদার যোদ্ধার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।

আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা জার্সিতে বাতিস্তুতা ছিলেন এক অবিসংবাদিত রাজা। লিওনেল মেসি সেই রেকর্ড ভাঙার আগে বাতিস্তুতাই ছিলেন আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা । ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নিষেধাজ্ঞা, ১৯৯৮ এর কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়।  বাতিস্তুতা সবসময় লড়াই করেছেন এক নি:সঙ্গ শেরপার মতো।

​২০০২ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। তখন সাইডবেঞ্চে বসা বাতিস্তুতার সেই অশ্রুসিক্ত মুখ আজও কোটি ফুটবল ভক্তের বুকে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। ওটাই ছিল আন্তর্জাতিক মঞ্চে মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়।

আজকের কর্পোরেট, হিসেবি ফুটবলের যুগে বাতিস্তুতা এক বিলুপ্তপ্রায় নক্ষত্র। যেখানে খেলোয়াড়রা প্রতি বছর ক্লাব বদলান টাকার অঙ্কে। সেখানে বাতিস্তুতা মনে করিয়ে দেন – ফুটবল কেবল গোল আর ট্রফির হিসাব নয়।

গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা কোনো নিখুঁত ঈশ্বর ছিলেন না, তিনি ছিলেন রক্ত-মাংসের এক ট্র্যাজিক হিরো। যিনি ফুটবল মাঠকে বানিয়েছিলেন তার মহাকাব্যের রণক্ষেত্র।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

ত্রিদেশীয় সিরিজে তুরুপের তাস কারা?

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে হাসান মাহমুদের প্রত্যাবর্তন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে চলেছেন হাসান! লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর বোলিংয়ের ধার এবার সাদা বলেও দেখতে চাইবে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা। গতি, নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ আর ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করার দক্ষতা তাঁকে করে তুলতে পারে পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা হতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ। টেস্টের আত্মবিশ্বাস ওয়ানডেতেও অনূদিত হলে হাসানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বোলিংয়ে যোগ করতে পারে বাড়তি ধার। তবে একাদশে সরাসরি জায়গা পাবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়ের জায়গা।

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

Share via
Copy link