চোখে চশমা আর লাজুক চাহনি। দেখে মনে হতো লাইব্রেরি থেকে কোনো এক মেধাবী ছাত্র ভুল করে ক্রিজে চলে এসেছে। অথচ সেই ১৮ বছরের চশমাধারী কিশোরই একদিন হয়ে উঠলেন কিউই ক্রিকেটের প্রধান সেনানী। ক্রিকেট মাঠে লড়াই করতে করতেই পেরিয়ে গেল তাঁর জীবনের অর্ধেকটা। তিনি আর কেউ নন, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি।
সময়ের পরিক্রমায় ভেট্টোরির বাহ্যিক অবয়ব অনেক বদলেছে। লম্বা সোনালী চুল ছোট হয়েছে, ফ্রেম বদলে চশমা হয়েছে আরও চওড়া, আর চিবুকে ঘন হওয়া দাড়ি যেন ঠিকরে ওঠা অভিজ্ঞতার সমতুল্য। কিন্তু, তাঁর বাঁ-হাতের বিধ্বংসী স্পিন আর মগজ খাটিয়ে বল করার জাদুকরী কৌশলে কখনো মরিচা পড়েনি।
ব্যাট হাতেও তিনি ছিলেন অদম্য। নিরলস পরিশ্রম করে নিজেকে লোয়ার অর্ডার ব্যাটার থেকে দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিডল অর্ডার ব্যাটারে পরিণত করেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকের পর রেকর্ডের এক সুবিশাল পাহাড়ও গড়েন ভেট্টরি।

টেস্ট ইতিহাসে ৪০০০ রান আর ৩০০ উইকেটের রাজকীয় ক্লাবে নাম লেখানোর কীর্তি খুব কম অলরাউন্ডারেরই আছে। বিশ্ব ক্রিকেটে তখন পর্যন্ত এই রেকর্ড ছিল কপিল দেব আর ইয়ান বোথামের মতো কিংবদন্তিদের।
টেস্টে জাতীয় দলের হয়ে একসময়ে দ্রুততম সেঞ্চুরি করা এই তারকা কিউই ক্রিকেটে রিচার্ড হ্যাডলির পর দ্বিতীয় সেরা প্রভাবশালী ক্রিকেটার হিসেবেই পরিচিত। তবে মাঠে ভেট্টরি ছিলেন সর্বদা অদ্ভুত রকমের শান্ত। কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে ইস্পাতকঠিন।
ফিল্ডার হিসেবেও অনবদ্য পারফরম্যান্স করেছেন ভেট্টরি কিউইদের জার্সিতে। ২০১৫ ওডিআই বিশ্বকাপে ৩৬ বছর বয়সী ভেট্টরি অবিশ্বাস্যভাবে বাউন্ডারি লাইন থেকে মারলন স্যামুয়েলসের যে এক হাতের ক্যাচটি নিয়েছিলেন, সেই দৃশ্য কোনো দর্শকই ভুলতে পারবেন না।

এরপরও বিশ্বের অবমূল্যায়িত ক্রিকেটারদের মধ্যে ড্যানিয়েল ভেট্টরির নাম অন্যতম। একবিংশ শতাব্দীর সেরা এই কিউই অলরাউন্ডারের দুর্দান্ত সব ব্লাইন্ডার, টার্ন যেন সৃজনশীল শিল্পের কারিকুরি। চশমা চোখে দলের ক্রান্তিকালে তাঁর খেলা সময়োপযোগী সব স্ট্রোক যেন অনবদ্য ক্রিকেটীয় কাব্যের অম্লান পঙক্তি।
তবু সবকিছুরই শেষ থাকে। তাই ১৮ বছর মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো ‘হ্যারি পটার’-এর মতো দেখতে মানুষটা যখন ২০১৫ এর বিশ্বকাপ ফাইনালে শিরোপার স্বপ্নভঙ্গের পর বিদায় নিলেন, বিশ্ব ক্রিকেট দেখল এক প্রকৃত জেন্টলম্যানের প্রস্থান। প্রস্থান এক জীবন্ত কিংবদন্তিরও।









