মহাপ্রলয়ের তিনি নটরাজ, তিনি সাইক্লোন, তিনি ধ্বংস!

ক্রিকেটে তখন ফাস্ট বোলারদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ঠিক সেই সময়ে এলেন এক বিদ্রোহী লেগস্পিনার। যিনি বল হাতে দেড় দশক ধরে প্রমাণ করে গেলেন, “…মহাপ্রলয়ের তিনি নটরাজ, তিনি সাইক্লোন, তিনি ধ্বংস!…” বলছি, শের্ন ওয়ার্নের কথা।

ক্রিকেটে তখন ওয়াসিম আকরাম, অ্যালান ডোনাল্ড কিংবা গ্লেন ম্যাকগ্রেথদের মতো ফাস্ট বোলারদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ঠিক সেই সময়ে ফ্লেক্সিবল কবজির কারিকুরি আর বিধ্বংসী ডেলিভারির নৈপুণ্য নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের ফের্নট্রি গালি থেকে এলেন এক বিদ্রোহী তরুণ লেগস্পিনার। যিনি বল হাতে দেড় দশক ধরে প্রমাণ করে গেলেন, ‘…মহাপ্রলয়ের তিনি নটরাজ, তিনি সাইক্লোন, তিনি ধ্বংস!…’ হ্যাঁ, তিনি শেন ওয়ার্ন।

১৯৯৩ সালে ইংলিশ ব্যাটার মাইক গ্যাটিংকে অবিশ্বাস্য এক ডেলিভারির সাহায্যে বোল্ড করেই প্রথম নিজের বোলিং নৈপুণ্যের জানান দেন ওয়ার্ন! লেগ স্টাম্পের বাইরে পিচ করা সেই বলটা ঘুরে গিয়ে যখন বেল স্পর্শ করেছিল, তখনই হয়তো অলিম্পাসের দেবতা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই তরুণকে তিনি কিংবদন্তি বানিয়েই ছাড়বেন! হয়েছেও ঠিক তা-ই!

সময় যত গড়িয়েছে, ওয়ার্নের বোলিং ততই হয়ে উঠেছে অনন্য ও পরিপক্ব। ক্রিজে কিছুটা ধীরগতির রানআপ নিয়ে শক্তিশালী কাঁধ ও কব্জির মোচড়ে বল ঘুরিয়ে তিনি যে প্রচণ্ড টার্নের সৃষ্টি করতেন, তাতে তাবড় তাবড় ব্যাটারদের অকাতরে উইকেট বিলিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত না! প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে তিনি তাঁর অনবদ্য সব ফ্লিপার, স্লাইডার আর মরণঘাতী গুগলির পসরা সাজাতেন ২২ গজে।

এসবের বদৌলতেই শেন ওয়ার্ন ক্রিকেট ইতিহাসের বহু রেকর্ড ভাঙা-গড়ার মহোৎসবে শামিল হন অপ্রতিরোধ্যভাবে। এরই ধারাবাহিকতায়, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে ৬০০ এবং ৭০০ উইকেট শিকারের মাইলফলক স্পর্শ করার অনন্য কীর্তি গড়েন এই লেগস্পিনার। এমনকি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শ্রীলঙ্কার মুত্তিয়া মুরালিধরনের পর মাত্র দ্বিতীয় বোলার হিসেবে হাজারের ওপরে উইকেট পাওয়ার অনন্য নজিরও এই অজি ক্রিকেটারের দখলে আছে।

এখানেই শেষ নয়! এক পঞ্জিকাবর্ষে মাত্র ১৫টি টেস্ট খেলে ২২.০২ গড়ে ৯৬টি উইকেট তুলে নিয়ে এক বছরে সর্বোচ্চ সংখ্যক টেস্ট উইকেট নেওয়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েন ওয়ার্ন। এই রেকর্ডে আজ পর্যন্ত আর কেউ ভাগ বসাতে পারেননি এখনও। পাশাপাশি, মর্যাদাপূর্ণ অ্যাশেজ সিরিজে ৩৬ টেস্টে রেকর্ড ১৯৫টি উইকেট পেয়েছেন ১৯৬৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্মানো এই স্পিনার। একক কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এটিই টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট পাওয়ার দৃষ্টান্তও, বটে!

ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া দলের স্বর্ণযুগের কৌশলগত প্রাণভোমরা হিসেবেও দ্যুতি ছড়িয়েছেন শেন ওয়ার্ন। প্রয়োজনের সময় প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপের ওপর আঘাত হেনে প্রায়শই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার। ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আসরটির সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে চারটি করে উইকেট শিকার করে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচের খেতাব পান ‘ওয়ার্নি’ বলে খ্যাত এই বোলার। টুর্নামেন্টটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকও নির্বাচিত হন তিনি!

বোলিংয়ের অনন্য ক্যারিশমা প্রদর্শন, একের পর এক রেকর্ড ভাঙা-গড়ার মিছিলে শামিল হওয়া কিংবা সর্বদা জয়ের জন্য তৃষার্ত মানসিকতা লালনের কারণে ক্রিকেট ইতিহাসের এক অমলিন পরিচ্ছদে পরিণত হয়েছেন এই কিংবদন্তি। নি:সন্দেহে তাই যতদিন ক্রিকেট থাকবে, ততদিন দর্শক-সমর্থকদের হৃৎপিণ্ডে সন্তপর্ণে স্পন্দিত হতেই থাকবে শেন ওয়ার্নের নাম!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

Share via
Copy link