গতানুগতিক প্রথার ধার ধারতেন না তিনি। দুর্দান্ত সব ডাইভ, শক্তিশালী ড্রপ কিক আর অনবদ্য পাঞ্চের সঙ্গে আগ্রাসী হুঙ্কারকে মিলিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণকে করে দিতেন নস্যাৎ। তিনি আর কেউ নন, জার্মান কিংবদন্তি গোলরক্ষক অলিভার কান, দ্য টাইটান সবাই বলে, ‘দ্য টাইটান’!
১৯৮৭ সালে কার্লস্রুহার এসসির মাধ্যমে পেশাদার ফুটবলে আত্মপ্রকাশ ঘটে এই ডাই ম্যানশ্যাফট কিংবদন্তির। ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে উয়েফা কাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখের নজরে আসেন তিনি। সে বছরই রেকর্ড ৪.৬ মিলিয়ন জার্মান মার্কের বিনিময়ে তিনি ব্যাভারিয়ানদের জার্সি গায়ে জড়ান।
বায়ার্নে অসাধারণ গোলকিপিংয়ের শৈলী এবং গেম ইম্প্যাক্টের কারণে অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন কান। সঙ্গে অনবদ্য নেতৃত্ব গুণ, জেদি ফুটবলীয় মেজাজ ও ব্যক্তিত্ব তাঁকে খেলাটির অভিনব চরিত্রে রূপান্তরিত করে। অধিনায়ক ও গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর ক্ষিপ্রতা ও কমান্ডিং প্রভাব ছিল দেখার মতো। রক্ষণে কোনো ভুল সহ্য না করার প্রবণতা ও ডিফেন্ডারদের শাসনের ক্ষমতা তাঁকে আরও বেশি অনন্য করে তোলে। বিশ্ব মিডিয়ায় তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘দ্য টাইটান’ নামে।

২০০৮ সালে ক্যারিয়ারের ইতি টানার আগপর্যন্ত বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৪২৯টি ম্যাচ খেলেন কান। জয় করেন সম্ভাব্য সব শিরোপা। এর মধ্যে ছিল আটটি বুন্দেসলিগা, ছয়টি ডিএফবি-পোকাল কাপ, একটি উয়েফা কাপ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ২০০১ সালে বায়ার্নের হয়ে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপও জয় করেন তিনি।
কিন্তু, এই ‘দ্য টাইটান’-এর আজীবনের আক্ষেপের নাম, একটা বিশ্বকাপ। বিশেষ করে, ২০০২ ফিফা বিশ্বকাপের গল্পটা তাঁর জন্য সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। সেবার বাছাইপর্বে ধুঁকতে থাকা তারকাহীন জার্মানিকে নিজের অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতা, রিফ্লেক্স আর নেতৃত্বের একক কারিকুরিতে ফাইনালে তোলেন তিনি।
আসরটিতে প্রথম কোনো জার্মান গোলরক্ষক হিসেবে রেকর্ড পাঁচটি ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়ার নজির গড়েন এই গোলরক্ষক। টুর্নামেন্টজুড়ে অনবদ্য পারফর্ম্যান্সের বদৌলতে ইতিহাসের একমাত্র গোলকিপার হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের অম্লান কীর্তিও গড়েন কান। একইসঙ্গে, ‘গোল্ডেন গ্লাভস’-এর পাশাপাশি পান গোলরক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘লেভ ইয়াসিন অ্যাওয়ার্ড’-ও!

নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! এতসব অর্জন সত্ত্বেও সেবার বিশ্বকাপ ট্রফিটাই উঁচিয়ে ধরা হয়নি এই মহানায়কের। ফাইনালে হাতের অনামিকায় চিড় নিয়েও জার্মানদের গোলবার ৬৭ মিনিট পর্যন্ত অক্ষত রেখেছিলেন কান। তবে, শেষ পর্যন্ত আর পারেননি। ব্রাজিলিয়ান তারকা রোনালদো জোড়া গোল করে কানদের স্বপ্ন চুরমার করে দেন।
পরে ২০০৬ বিশ্বকাপে খেললেও, আক্ষেপ আর ঘুচাতে পারেননি কান। সেমিফাইনালেই বিদায় নিতে হয় জার্মানিকে সেবার। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ না পেলেও কানের ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলি ছিল সমৃদ্ধ। টানা চারবার উয়েফা সেরা ইউরোপীয় গোলরক্ষকের পুরস্কার জেতেন তিনি। ১৯৯৯, ২০০১ এবং ২০০২ সালে তিনবার পান আইএফএফএইচএস বিশ্বের সেরা গোলরক্ষক হওয়ার সম্মাননা। দুবার বর্ষসেরা জার্মান ফুটবলারও নির্বাচিত হন তিনি।
বিশ্বকাপের ট্রফি অধরা থেকে গেলেও ফুটবল ইতিহাসে অলিভার কানের নাম চিরকাল শোভা পাবে স্বর্ণাক্ষরে। ক্লাব ফুটবলে তাঁর সাফল্যের ঝিলিক আর অনন্য ব্যক্তিগত অর্জনের পসরাই তাঁকে দিয়েছে চিরন্তন অমরতা। অলিম্পাসের দেবতা হয়ত, এটাই লিখে রেখেছিলেন তাঁর নিয়তিতে!











