২০১০ সালের আগস্টে মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক, আর অভিষেকেই গোল। ঠিক ১৬ বছর পর, একই স্টেডিয়ামে শেষবারের মতো গোল করলেন নেইমার। তবে এবার সেই গোল জয় এনে দেয়নি, এনে দিয়েছে বিদায়ের অশ্রু।
যেখানে শুরু, সেখানেই শেষ।১৬ বছর পর সেই ছেলেটাই বিদায় বললেন সেই জার্সিকেই—কোনো বিশ্বকাপ ছাড়া, কোনো কোপা আমেরিকা ছাড়া। মাঝে ছিল ভাঙা মেরুদণ্ড, ছেঁড়া লিগামেন্ট, বারবার স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার দৃশ্য—তবু প্রতিবার ফিরে এসেছিলেন। শেষটায় আর ফেরা হলো না।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায়ের পরই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে আর হয়তো দেখা যাবে না তাকে। মঙ্গলবার কোপা সুদামেরিকানায় ভেনেজুয়েলার ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালকে ৪-২ গোলে হারানোর পর সেই জল্পনারই ইতি টানলেন নেইমার।

৩৪ বছর বয়সী এই তারকা জানিয়ে দিলেন, ব্রাজিল জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা এখানেই শেষ। হলুদ জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন, কিন্তু এবার নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সময় এসেছে।
নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচটাও ছিল যেন তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রতিচ্ছবি। ম্যাচের শেষদিকে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন, কিন্তু তাতেও হার এড়াতে পারেনি ব্রাজিল। শেষ বাঁশি বাজতেই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ঘাসে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সেটিই হয়ে থাকল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ মুহূর্ত।
নেইমারের জাতীয় দল ক্যারিয়ার শুধু গোল বা রেকর্ডের গল্প নয়, এটি একই সঙ্গে দুর্ভাগ্যেরও গল্প। ২০১৪ বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ভয়াবহ চোটে ভেঙে যায় তার মেরুদণ্ড। সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসাকে হারিয়ে স্বপ্নও ভেঙে গিয়েছিল স্বাগতিকদের।

এরপর ২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। এমন আরও অসংখ্য চোট, অস্ত্রোপচার আর পুনর্বাসনের পথ পেরিয়েও প্রতিবারই ফিরেছেন দেশের জার্সিতে। কিন্তু ভাগ্য যেন কখনোই পুরোপুরি তার পাশে দাঁড়ায়নি।
তবুও ব্রাজিলের হয়ে তার রেখে যাওয়া অর্জন ঈর্ষণীয়। ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ৮০ গোল, সঙ্গে ৫৯টি অ্যাসিস্ট। ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে ক্যারিয়ার শেষ করছেন তিনি। অথচ এত রেকর্ডের মাঝেও বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতাতে না পারার আক্ষেপ আজীবন সঙ্গী হয়ে থাকবে নেইমারের।
জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক একটি বিতর্ক নিয়েও মুখ খুলেছেন এই ফরোয়ার্ড। চ্যাপেকোয়েন্সের বিপক্ষে ম্যাচের পর তরুণ সতীর্থ গ্যাব্রিয়েল ও জোয়াও আনানিয়াসকে অপমান করার অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। নেইমার সেই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, অধিনায়ক হিসেবে সতীর্থদের আরও ভালো খেলতে উৎসাহ দেওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য, কাউকে ছোট করা নয়।

জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও ক্লাব ফুটবলে এখনো শেষ হয়ে যাননি নেইমার। ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে বদলি নেমে সান্তোসের ৪-২ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। সেই জয়ে কোপা সুদামেরিকানার শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে সান্তোস, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে ইকুয়েডরের মাকারা।
হয়তো ট্রফির হিসাব বলবে নেইমার তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে চোখের জল, অবিশ্বাস্য ড্রিবল, অসংখ্য গোল আর কখনো হার না মানা প্রত্যাবর্তনের গল্পে নেইমারের নাম লেখা থাকবে চিরকাল। কিছু কিংবদন্তির পরিচয় ট্রফিতে নয়, তাদের লড়াইয়েই।











