উত্তাল জাহাজের দিশাহীন নাবিক

মিরাজ যদি এই সময়ের গুরুত্বটা বুঝে ফেলতে পারেন, বাজিমাৎ করে ফেলতে পারেন - তাহলেই কেবল যোগ্য কাণ্ডারি হয়ে উঠতে পারবেন তিনি।

উত্তাল সাগরের বুকে নতুন নাবিক। ভারত মহাসাগরের ওপরে লঙ্কান দ্বীপে টালমাতাল জাহাজ। ওয়ানডের নতুন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের কাঁধে দায়িত্বের শেষ নেই। প্রিয় ফরম্যাট ওয়ানডেতেই এখন র‌্যাংকিয়ের দশ নম্বর দল বাংলাদেশ। এর থেকে উত্তোরণের জন্য আগুন পথে হাঁটতে হবে নতুন অধিনায়ককে।

এর আগে সামলাতে হবে ড্রেসিংরুমের সংকট। বাংলাদেশ ক্রিকেটে দলীয় টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখন যে অস্থিরতা, সেটাকে সামলানো মিরাজের জন্য ভিষণ কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। ক্রিকেট অপরাশন্সের কোনো চাপ যদি থেকে থাকে, সেটা মিটিয়ে ফেলতে হবে মিরাজকে।

নাজমুল হোসেন শান্তকে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে মিরাজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শান্ত টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন। যদিও তিনি বলেছেন, সিদ্ধান্তটি ব্যক্তিগত, তবে তিন ফরম্যাটে তিন অধিনায়ক থাকা কতটা ভালো হবে তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে।

মিরাজকে তাই ড্রেসিংরুমে খোলস ভেঙে নিজের পথ তৈরি করতে হবে। মাঠের ক্রিকেটে নজর দিতে নিজের ব্যাটিং অর্ডার ‘চূড়ান্ত’ করতে হবে। দলের ব্যাটিংকে দিতে হবে একটা স্থিতিশীলতা। প্রশ্ন আছে, ওপেন করবেন কে? কে হবেন তানজিদ হাসান তামিমের সঙ্গী? সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে মিরাজকে।

লিটন দাস ও মোহাম্মদ নাইম শেখ ফিরেছেন দলে। তবে লিটন ফর্মহীন, শেষ পাঁচ ওয়ানডে ইনিংসে তার রান মাত্র ৬। তবুও তার অভিজ্ঞতা ও উইকেটকিপিং দক্ষতা তাকে এগিয়ে রাখছে। পারভেজ ইমন দলে আছেন, তবে এই ফরম্যাটে এখনও প্রস্তুত নন।

শান্ত সম্ভবত তিন নম্বরে ফিরবেন, যদিও শেষ ওয়ানডেতে ওপেনিংয়ে নেমে করেছিলেন ৭৭ রান। লিটনকে মিডল অর্ডারে খেলানোর পরিকল্পনা করছে দল। সেই পরিকল্পনায় গেলে মিরাজ নিজে খেলবেন কোথায়? সেই প্রশ্নের উত্তর মিরাজকেই দিতে হবে।

মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বিদায় নিয়েছেন, সাকিব আল হাসানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অভিজ্ঞতার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে মিডল অর্ডারে, তা পূরণ করা সহজ নয়। তাওহীদ হৃদয়, জাকের আলী, শামিম হোসেন পাটোয়ারিরা আছেন, কিন্তু তারা এখনও অভিজ্ঞতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। তারুণ্যতে ভরসা রাখতেই হবে মিরাজকে, পরীক্ষা চালাতে হবে, সঠিক কম্বিনেশন খুঁজে বের করতে হবে।

সাকিবের অনুপস্থিতিতে স্পিন বিভাগ ধসে পড়েছে। গত ১৫ ওয়ানডেতে স্পিনারদের গড় ৬৫.৬৯—উইকেট মাত্র ২৩টি।
মিরাজ নিজেও ৯ উইকেট পেয়েছেন, তবে গড় ৭১-এর ওপরে। রিশাদ বা নাসুমও সুবিধা করতে পারছেন না। তানভির ইসলাম এখনও ওয়ানডে খেলেননি। টি-টোয়েন্টিতে সুযোগ পেয়েও প্রভাব ফেলতে পারেননি।

এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলবে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে, যারা ঘরের মাঠে স্পিনে সবচেয়ে সফল দল। স্পিন আক্রমণের নেতা কার্যত এখন মিরাজই। স্পিনের দূর্দশা কাটাতে হবে তাঁকেই।

স্পিন আক্রমণ যখন অনিশ্চিত, তখন ভরসা পেস। তাসকিন ও মুস্তাফিজ ফিরেছেন, সঙ্গে আছেন হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা ও তানজিম। তাসকিন-মুস্তাফিজ বড় নাম, তবে কে আসল ওয়ানডে স্পেশালিস্ট, কে হবেন পেস আক্রমণের নেতা – সেটা মিরাজকে দ্রুত বুঝতে হবে।

বিশ্বকাপ দু’বছর দূরে। তাসকিন এখনও ফিট নন, তারপরও তিনি ওয়ানডে দলে। তাঁকে ঘিরে বাংলাদেশের মাইন্ডসেট কি? মিরাজের জানতে হবে, বুঝতে হবে, করতে হবে কর্মপরিকল্পনা।

শ্রীলঙ্কাকে হারালে বাংলাদেশ একধাপ উপরে উঠতে পারে র‌্যাংকিংয়ে। তবে, সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করা। তাই এই সময়টা, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজটা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিরাজ যদি এই সময়ের গুরুত্বটা বুঝে ফেলতে পারেন, বাজিমাৎ করে ফেলতে পারেন – তাহলেই কেবল যোগ্য কাণ্ডারি হয়ে উঠতে পারবেন তিনি।

লেখক পরিচিতি

সম্পাদক

Share via
Copy link