ইনজুরিমাখা জীবনের শেষ লড়াই!

নেইমারের ক্ষতবিক্ষত শরীর হয়তো আর কখনো আরেকটি বিশ্বকাপের ধকল সইতে পারবে না। এটাই তাঁর শেষ সুযোগ, জোগা বোনিতোর শেষ প্রদর্শনী।

ফুটবল যদি হয় কোনো নিখুঁত শিল্পকলা, তবে সেই ক্যানভাসের অবিস্মরণীয় জাদুকরের নাম নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলিয়ান জোগা বোনিতোর শেষ মহান উত্তরাধিকারী তিনি, যাঁর পায়ে বল মানেই এক জীবন্ত কবিতা। অথচ এই রাজকুমারের ক্যারিয়ার যেন শুধুই এক ট্র্যাজিক আক্ষেপের গল্প। নিয়তির নির্মম পরিহাস আর ইনজুরির ছায়া তাঁকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে, ভেঙেছে ব্রাজিলের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন।  

নেইমার মানেই এক বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণতার মহাকাব্য। ২০১৪ সালের ঘরের মাঠে কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই ভয়াল ইনজুরি আজও ব্রাজিলের কোটি ভক্তের মনে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সেদিন সুনিপুণ এক হেক্সার স্বপ্ন মাঝপথেই থমকে গিয়েছিল। ইনজুরি যদি ছায়ার মতো ধাওয়া না করত, তবে হয়তো ২০১৪ সালেই মারাকানায় লেখা হতে পারতো তাঁর বিশ্বজয়ের অমর উপাখ্যান।

২০০২ সালের পর থেকে ব্রাজিলের ফুটবল অনুরাগীদের জন্য বিশ্বকাপ শুধুই এক ক্লান্তিহীন অপেক্ষার নাম। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই সোনার ট্রফিটা অধরাই থেকে গেছে। ক্লাব ফুটবলের সব বড় শিরোপা জিতলেও, নেইমারের মনের কোণে আজও বিশাল শূন্যতা রয়ে গেছে। সেলেসাওদের সেই পরম আরাধ্য সোনালী শিরোপা এনে দিতে না পারার আক্ষেপ তাঁকে পুড়িয়েছে প্রতিনিয়ত।

ইউরোপের জমকালো মঞ্চ থেকে নেইমারের বিদায়ের পেছনেও খলনায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই ইনজুরি। প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন থেকে আল-হিলাল হয়ে আজ তিনি ঘরের ছেলে ঘরে ফিরেছেন, থিতু হয়েছেন শৈশবের সান্তোসে। অনেকেই ভেবেছিলেন রাজকুমারের গল্পটা বুঝি শেষ। কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তাঁর জায়গা পাওয়া নিয়ে জমেছিল সংশয়ের কালো মেঘ।

কিন্তু ফিনিক্স পাখির মতোই আবার নেইমারের ফিরে আসা। সব সংশয় উড়িয়ে দিয়ে, নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে নেইমার আবারও জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। শরীর ভাঙলেও, মনের ভেতরের সেই জেদ আর ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি। পেলের দেশের ১০ নম্বর জার্সির মর্যাদা ধরে রাখতে তিনি আবারও প্রস্তুত।

নেইমারের ক্ষতবিক্ষত শরীর হয়তো আর কখনো আরেকটি বিশ্বকাপের ধকল সইতে পারবে না। এটাই তাঁর শেষ সুযোগ, জোগা বোনিতোর শেষ প্রদর্শনী। এবার তাই আর কোনো আক্ষেপ নয়, শুধুই রাজকীয় এক সমাপ্তির অপেক্ষা। নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও হেক্সা জিতে মাঠ ছাড়ার লক্ষ্য নিয়েই এবার নামবেন নেইমার।

বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসে এবার শেষবারের মতো জ্বলে উঠুক সেই চিরচেনা জোগা বোনিতোর জাদু। নেইমারের পায়ের জাদুতে কেটে যাক ব্রাজিলের দীর্ঘ দুই দশকের ট্রফির খরা। রাজকুমারের ক্যারিয়ারের শেষ গল্পটা বিষাদের নয়, বরং বিশ্বজয়ের সোনালী হরফে লেখা হোক, বিশ্বজোড়া কোটি ভক্তের আজ এটাই একমাত্র আকুল প্রার্থনা।

 

লেখক পরিচিতি

বেঁচে আছি না পড়া বইগুলো পড়ব বলে

Share via
Copy link