আপনি ফিরে আসছেন, যেখান থেকে ফেরার কথা ছিল না। ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এমন সময় সবাই যখন ধরেই নিয়েছিল সব শেষ। এটাকেই প্রত্যাবর্তন বলে। তবে কিছু প্রত্যাবর্তন একটু আলাদা, মাহাত্ম্য বিবেচনায় সমস্ত বিশেষণের বাইরে। ক্যানসারকে হারিয়ে নিক ম্যাডিনসনের গল্পটা যেমন।
যে মানুষটাকে একটা সময় ক্যানসার কেড়ে নিতে বসেছিল ক্রিকেট থেকে, জীবন থেকে স্বাভাবিকতার শেষটুকুও ছিনিয়ে নিতে বসেছিল, সেই মানুষটাই ৩৪ বছর বয়সে ফিরলেন অস্ট্রেলিয়ার জার্সি গায়ে।
কিন্তু এই জায়গাটায় পৌঁছাতে ম্যাডিনসনকে পাড়ি দিতে হয়েছে এমন এক পথ, যেখানে প্রতিপক্ষ ছিল ক্যানসার। ছিল অসহ্য যন্ত্রণা। ছিল নিজের শরীরের সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধ। যেটা জেতা প্রায় অসম্ভব।
একটু হাসপাতালের বিষণ্ন দিনগুলোতেই চোখ রাখি। গত বছরের মাঝামাঝি ধরা পড়ে টেস্টিকুলার ক্যানসার। অস্ত্রোপচার হলো। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল। শুরু হলো কেমোথেরাপি। ক্রিকেট তখন বহু দূরের কোনো গল্প। নেট, মাঠ, ব্যাট—সবকিছু যেন হঠাৎ করেই জীবনের বাইরে চলে গেল।

আর ঠিক তখনই ম্যাডিনসনের ঘরেও চলছিল আরেক যুদ্ধ। তাঁর স্ত্রী বিয়াঙ্কা অপেক্ষা করছিলেন দ্বিতীয় সন্তানের। ঘরে ছিল আরও একটি ছোট্ট সন্তান। পরিবারকে সময় দিতে, স্বামীকে এই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে সাহায্য করতে চাকরি ছেড়ে দিলেন বিয়াঙ্কা।
কেমোথেরাপির দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহেই মাথার সব চুল পড়ে গেল। শরীর ভেঙে যাচ্ছিল। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে স্টেরয়েড নিতে হতো। আর সেই স্টেরয়েড কেড়ে নিত রাতের ঘুমও। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হাসপাতাল। বাড়ি ফিরে ঘুম। জোর করে রাতের খাবার। তারপর আবার ঘুম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সকাল পর্যন্ত আর চোখে ঘুম নেই।
এতকিছুর পরও তিনি থামেননি। সর্বশেষ কেমোথেরাপির মাত্র ১০ দিন পরই আবার নেটে ফিরলেন। হাতে উঠল ব্যাট। শরীর হয়তো তখনও পুরোপুরি সায় দিচ্ছিল না, কিন্তু মনটা যেন বলে দিয়েছিল, শেষ হয়ে যায়নি। সবকিছুর শেষ হয় না।
ম্যাডিনসনের ক্রিকেটজীবনে ফিরে আসার গল্প অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে বিরতি নিয়েছিলেন। ২০১৯ সালেও পাকিস্তানের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের ম্যাচ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন একই কারণে। চোটও তাঁকে কম থামায়নি। ২০১৮ সালে ঝাই রিচার্ডসনের বলে হাত ভেঙেছিল। ২০২৩ সালে এসিএল চোটে এক বছরের বেশি সময় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই একটা জিনিস একই ছিল, ম্যাডিনসন ফিরে এসেছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের জন্য অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট দল ঘোষণা হলো। সেখানে নিক ম্যাডিনসনের নাম আছে। তবে এই ম্যাডিনসন পরাজয়ের হিসাব থেকে অনেক উঁচুতে দাঁড়িয়ে। সমস্ত অবিশ্বাস, অসম্ভবকে পাশ কাটিয়ে যে উঠে দাঁড়ায়, জিতে চায়, সেই তো নায়ক, মহানায়ক। যিনি হেরে যাওয়া শব্দটাকে ব্যাকস্পেস দিয়ে মুছে দিয়ে লিখে ফেলে, আরেকবার শুরু করি চলো।










