বিশ্বকাপ কি কেবলমাত্র শক্তিশালী স্কোয়াড থাকলেই জিতে ফেলা যায়? উত্তর হলো না। কেবলমাত্র ভাগ্য পাশে ছিল না বলেই বহু পরাক্রমশালী স্কোয়াডও বিশ্বকাপ থেকে ফিরে গেছে শিরোপাকে একবার স্পর্শ করতে না পেরেই। আজকের আয়োজনে আমরা জানবো এমনই সব স্কোয়াডগুলো নিয়ে, যাদের বিশ্বজয়ী হওয়ার সব সক্ষমতা থাকলেও হেরে গিয়েই বিদায় নিতে হয়েছে।
শুরুটা ১৯৫৪ সালের ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’ হাঙ্গেরিকে দিয়ে। টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত থাকা দলটি ফাইনালে সেই জার্মানির কাছেই ৩-২ ব্যবধানে হেরে বসে। ইনজুরি নিয়ে খেলা ফেরেঙ্ক পুসকাসের সেই হাঙ্গেরির পরাজয় ফুটবলের অন্যতম এক ট্র্যাজিক গল্প।
এরপর ১৯৭৪-এর নেদারল্যান্ডস। ইয়োহান ক্রুইফদের ‘টোটাল ফুটবল’ জাদুতে তখন মোহিত ছিল বিশ্ব। ফাইনালে জার্মানি বল স্পর্শ করার আগেই গোল দিয়েও শেষ পর্যন্ত হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় ডাচদের। পরের বিশ্বকাপেও ফাইনালে জায়গা করে নেয় ডাচরা। তবে, আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ গোলে হেরে যায় তারা। টানা দুই ফাইনাল খেলেও ট্রফি ছোঁয়া হয়নি ডাচ ফুটবলের সেই সোনালী প্রজন্মের।

১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলটিকে বলা হয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক স্কোয়াড। জিকো, সক্রেটিস, ফ্যালকাওদের নিয়ে গড়া সেই শৈল্পিক দলটির ইতালির বিরুদ্ধে শুধু ড্রয়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পাওলো রসির হ্যাটট্রিকে ৩-২ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল আর স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো ফুটবল বিশ্ব।
১৯৯৪ সালের ইতালি দলটিতে ছিলেন পাওলো মালদিনি, ফ্রাঙ্কো বারেসি এবং রবার্তো বাজ্জিওর মতো তারকারা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনাল টাইব্রেকারে গড়ালেই পতন ঘটে ইতালির। পেনাল্টি মিস করে বাজ্জিওর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্য আজও ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করে।
১৯৯৮ সালের ব্রাজিল ছিল ফেভারিট। রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, রবার্তো কার্লোসদের নিয়ে গড়া সেই দল ছিল শিরোপা জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার। কিন্তু, ফাইনালের আগে দলের সেরা তারকা রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতা পুরো সমীকরণ বদলে দেয়। ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয় গত শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই আক্রমণভাগ।

২০০৬ সালের পর্তুগাল ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সুসংগঠিত দল। কিংবদন্তি লুইস ফিগো, ডেকো এবং তরুণ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সেই দল সেমিফাইনালে জিদানের গোলে ফ্রান্সের কাছে হেরে বসে। এরপর পর্তুগাল আর কখনোই সেমিফাইনালে উঠতে পারেনি।
২০১০ সালে একদম নতুন প্রজন্মে ভর করে নেদারল্যান্ডস আবারও ফাইনালে ওঠে। কিন্তু ১১৬তম মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই মহাকাব্যিক গোলে স্পেনের কাছে হেরে যায় ডাচরা। তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলে প্রতিবার হারের মুখ দেখা নেদারল্যান্ডস এক আপসেটের নাম।
২০১৮ সালের বেলজিয়ামের ‘গোল্ডেন জেনারেশন’ ইডেন হ্যাজার্ড, ক্যাভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকুদের নিয়ে বছরের পর বছর র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ছিল। কিন্তু সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়েও শিরোপা স্পর্শ করা হয়নি তাদের।

সর্বশেষ ২০২২ সালের ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের ফাইনালে হ্যাটট্রিক সত্ত্বেও টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায় আগের বিশ্বকাপের চ্যম্পিয়নরা। ফ্রান্সের দল ছিল এই যুগের সবচেয়ে প্রতিভাবান স্কোয়াড। কিন্তু এমবাপ্পের অতিমানবীয় লড়াইও তাদের শিরোপা এনে দিতে পারেনি।
বিশ্বকাপ এমনই এক ময়দান যেখানে একবার হোঁচট খেলেই ভেঙে যায় স্বপ্ন। ভাগ্য সঙ্গে না থাকলে শিরোপার দেখা না পেয়েই ফিরতে হয় দেশে। শক্তিশালী এই স্কোয়াডগুলোর গল্প যেন সেই কথাই আবারও জানান দেয়।










