বহু নাটকীয়তা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং বারবার প্রত্যাখানের পর তুরস্কের বিপক্ষে অবশেষে ঘটল সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা। ফ্রান্স ফুটবল ফেডারেশনের একের পর এক প্রস্তাবকে ফিরিয়ে যিনি একসময় সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা তাঁর নেই, সেই জিনেদিন জিদানই আজ লে ব্লুজদের নতুন কাণ্ডারি। ১৯৯৮ সালের বিশ্বজয়ী ফরাসি ফুটবলের মহানায়ক এবার এক সম্পূর্ণ নতুন ভূমিকায় ডাগআউটে দাঁড়িয়ে বিশ্ব ফুটবলে ফরাসি সাম্রাজ্য পুন:প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছেন।
জাতীয় দলের দায়িত্ব নিয়ে জিদান যে স্কোয়াডটি হাতে পেয়েছেন, তা যেকোনো ফুটবলের মাস্টারমাইন্ডের জন্য পরম স্বপ্নের। বিশেষ করে এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বিধ্বংসী ও তারকাবহুল আক্রমণভাগ এখন তাঁর ট্যাকটিকাল বোর্ডের অধীনে।
কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি ও নিশানায় নিখুঁত ফিনিশিং, মাইকেল ওলিসের সৃষ্টিশীলতা এবং উসমান দেম্বেলের অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং! সেই সাথে রাইয়ান চেরকি, দেজিরে দুয়ে, ব্রাডলি বারকোলা ও মার্কাস থুরামদের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান তারকা। এই সুবিশাল তারকাবহুল আক্রমণাগারকে একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় এনে প্রতিপক্ষের জন্য অজেয় করে তোলাই এখন জিদানের মূল মিশন।

কোচিং ক্যারিয়ারে জিদানের ইতিহাস মানেই সাফল্য ও ঐতিহাসিক ট্রফির গল্প। রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে প্রথমবার নেমেই টানা তিনটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি। মাদ্রিদে জিদানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলের তারকাখচিত ড্রেসিংরুম সামলানো এবং মেগা স্টারদের থেকে সেরাটা বের করে আনা।
কৃত্রিম কোনো কঠিন নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা করিম বেনজেমাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে জয়ের মানসিকতা তৈরি করাই ছিল তাঁর প্রধান জাদু। ফরাসি দলেও এখন একঝাঁক সুপারস্টার বিদ্যমান, আর তাই বড় তারকাদের মানসিকতা বুঝে তাদের এক সুতোয় বাঁধার অলৌকিক ক্ষমতা ফ্রান্সকে ট্রফি জয়ের পথে নতুন এক গতি এনে দেবে।
কৌশলগত দিক থেকে জিদানকে কখনোই কোনো নির্দিষ্ট একঘেয়ে ফুটবলের অনুসারী বলা যায় না। তিনি মূলত পরিস্থিতি ও প্রতিপক্ষ বুঝে মানিয়ে নেওয়ার একজন ওস্তাদ। ফ্রান্সে তাঁর ট্যাকটিকাল ছকে তিনি সাধারণত চার ডিফেন্ডার ব্যাকলাইনে রেখে উইং ভিত্তিক আক্রমণ চালাতে বেশি পছন্দ করবেন।

এমবাপ্পে, দেম্বেলে ও ওলিসদের গতিকে কাজে লাগিয়ে ফরাসিদের দুই উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের হাফ স্পেস চূর্ণ করাই হবে তাঁর মূল পরিকল্পনা। পাশাপাশি, ডাইনামিক পজেশন বজায় রেখে মিডফিল্ড থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বল হারানোর সাথে সাথেই উচ্চমাত্রার প্রেসিং তৈরি করার ওপর জোর দেবেন তিনি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, জিদান কখনোই তাঁর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের কড়া ট্যাকটিক্সের শেকলে বাঁধেন না। চেরকি বা ওলিসদের মতো ক্রিয়েটিভ খেলোয়াড়দের চূড়ান্ত থার্ডে স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ দেবেন, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণের পক্ষে অনুমান করা অসম্ভব করে তুলবে।
নব্বইয়ের জুলাইয়ে প্যারিসের রাতে যে জাদুকর ফুটবলের ক্যানভাসে নিজের তুলিতে এঁকেছিলেন বিশ্বজয়ের নিখুঁত ছবি, আড়াই দশক পর সেই একই স্পর্শে কি বেঁচে উঠবে ফরাসি ফুটবলের আত্মা? জিদানের আগমন কেবল এক নতুন কোচের দায়িত্বগ্রহণ নয়, যেন দীর্ঘ প্রবাস শেষে ঘরে ফেরা কোনো সম্রাটের রাজ্যাভিষেক।












