মোহাম্মদ নবী যখন একের পর এক ছক্কা হাঁকাচ্ছিলেন, তখনই একটু একটু করে মৃত্যু ঘণ্টা বাজছিল সুরঙ্গ ওয়েলেলাগের।
ম্যাচ শেষে ছেলে দুনিথ ওয়েলেলাগে জানলেন তার বাবা ছেড়েছেন পৃথিবীর মায়া। পরপারের অনন্ত যাত্রার পথিক এখন তিনি। কি নিদারুণ বেদনা! কি অসহ্য যন্ত্রণা! ওয়েলেলাগের বুক জুড়ে তখন নিশ্চয়ই চলছে এক প্রলয়ংকারী ঝড়ের তাণ্ডব। মোহাম্মদ নবীর এক ওভারে পাঁচ ছক্কা যে ঝড়ে সামনে নস্যি। বালুকণার চাইতে নয় বেশি কিছু। ওই একটি ওভারই ওয়েলেলাগের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল।
জীবন মানে কেমন যেন—জয়ের আনন্দের মাঝেই এক অনিবার্য হার। ম্যাচের পর শ্রীলঙ্কার ড্রেসিংরুমে যখন সতীর্থদের মুখে জয়ধ্বনি, তখন দুনিথ ওয়েলালাগের জীবনে নেমে এলো দু:স্বপ্ন।

এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দুনিথ ওয়েলেলাগে ছিলেন শ্রীলঙ্কার একাদশে। আফগানিস্তান বা-হাতি স্পিনের বিপক্ষে মোটেও সাবলীল নয়। সেই ভাবনা থেকেই হয়ত তার অন্তর্ভুক্তি। ছেলে এশিয়া কাপে খেলতে নেমেছেন। বাবা সুরঙ্গ ওয়েলোগে প্রচণ্ড উৎসাহ নিয়ে টিভি সেটের সামনে খেলা দেখতে বসেছেন। কিন্তু সেটাই যে ছিল তার শেষ দেখা।
ওয়েলেলাগে যখন নবীর কাছে হচ্ছেন তুলোধুনো, ওই সময়ে ছেলের করুণ দশা বাবার ধমনীতে বাড়িয়েছে রক্তের দোলাচল। বয়স হয়েছে, বড় মঞ্চে ছেলের অসহায়ত্ব তাকে পীড়া দিয়েছে। সেই পীড়া আর সহ্য করতে পারেননি দুনিথ ওয়েলেলাগে বাবা। বুকের পাজড়ে তখন অনুভব করেন তিনি প্রচণ্ড ব্যথা।
তড়িঘড়ি করে তাকে নেওয়া হল হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে যেন সবকিছু শেষ। হৃদপিণ্ড নামক সেই মাংসাল যন্ত্র তার নিজের কাজের ইচ্ছে হারিয়ে ফেলেছে। পরলোকের পথে গমন করেছেন সুরাঙ্গা ওয়েলেলাগে। তরুণ বয়সে যিনি প্রিন্স অব ওয়েলস কলেজ ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করেছেন, মাঠের লড়াইয়ে নিজেকে উজার করে দিয়েছেন, জীবনের শেষ লড়াইয়ে তিনি হেরে গেলেন।

দুনিথ ওয়েলেলাগে তখনও কিছুই জানেন না। আর দশটা স্বাভাবিক ম্যাচের দিনের মতই তার মস্তিষ্ক জুড়ে ম্যাচের চিন্তাভাবনা। শঙ্কা উড়িয়ে, শ্রীলঙ্কা পেল জয়। কিন্তু হেরে গেলেন দুনিথ। হারিয়ে ফেললেন পরম মমতায় ছায়া হয়ে থাকা বিশালদেহী সেই বটগাছ। ম্যাচের মধ্যে তাকে জানানো হয়নি কিচ্ছুটি। পেশাদারিত্বের ভয়বহতা সম্ভবত এটাই। ওয়েলালাগে যখন জানলেন তখন তার বাবার অস্তিত্ব স্রেফ নিথর এক দেহ। দেশ থেকে বহুদূরে দুনিথ ওয়েলেলাগের হৃদয় তখন বেদনায় ক্ষত-বিক্ষত।
এই ক্ষত তাকে ভেঙে দেবে, নাকি গড়ে তুলবে নতুন করে? যে চর্মগোলক তার বাবাকে কেড়ে নিল, সে বল হাতে কি ওয়েলেলাগের সাহস হবে আরও একটিবার মাঠে নামার? নাকি, প্রতিটি ওভার, প্রতিটি ডেলিভারি হয়ে যাবে বাবাহীন শূন্যতার আর্তনাদ? ওয়েলেলাগে কে ফিরতে হবে, ওপর থেকে বাবা দেখবেন, কি করে প্রতিপক্ষের বুকের পাঁজর দুমড়ে-মুচড়ে ফেলতে জানেন ওয়েলেলাগে।











