ইতিহাস কেবল বিজয়ীর নাম মনে রাখে, কিন্তু সেই বিজয়ের নেপথ্যে থাকা কারিগরেরা প্রায়শই থেকে যান লোকচক্ষুর অন্তরালে। শচীন টেন্ডুলকার যখন বিশ্ব সেরা ব্যাটার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন, তখন মাঠের বাইরে তাঁর প্রতিটি সংকট মোচনে ছায়ার মতো ছিলেন তাঁর উত্তমার্ধ অঞ্জলি টেন্ডুলকার। ১৯৯৮ সালের একটি বিশেষ ঘটনা যেন সেই নিভৃত প্রেমেরই এক অনন্য দলিল।
১৯৯৮ সালের ২৭ আগস্ট। ক্রিকেটীয় মহান কিংবদন্তি স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের ৯০তম জন্মদিন। ব্যাটিংয়ের সেই জাদুকর স্বীয় জন্মদিনে দুজনকে খুব করে কাছে চেয়েছিলেন। একজন শচীন টেন্ডুলকার এবং অন্যজন শেন ওয়ার্ন। এমন বিরল সম্মান পেয়ে শচীন আপ্লুত হলেও মনে এক দ্বিধা ছিল।
কারণ, ঠিক দুদিন পরই অর্থাৎ ২৯ আগস্ট দিল্লীতে তাঁর হাতে ওঠার কথা ছিল ভারতের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান ‘রাজীব গান্ধী খেলরত্ন’ পুরস্কার। একদিকে ব্র্যাডম্যানের সান্নিধ্য, অন্যদিকে দেশের দেওয়া পরম সম্মান – দুইয়ের টানাপোড়েনে ক্রিকেট ঈশ্বর তখন কিছুটা দিশেহারা।

সংকট বাঁধল প্রটোকল নিয়ে। সরকারি সেই অনুষ্ঠানে একটি নির্দিষ্ট পোশাক পরা বাধ্যতামূলক ছিল, যা ছিল মুম্বাইয়ে শচীনের বাড়িতে। হাতে সময় নেই, অ্যাডিলেড থেকে মুম্বাই হয়ে দিল্লি যাওয়া প্রায় অসম্ভব। শচীনের এই দোদুল্যমানতায় ত্রাতা হয়ে দাঁড়ালেন অঞ্জলি। মুম্বাই থেকে সেই পোশাক নিয়ে তিনি নিজেই ছুটলেন দিল্লি, আর শচীন সরাসরি অ্যাডিলেড থেকে পৌঁছালেন অনুষ্ঠানস্থলে। প্রিয়তমার তৎপরতায় রক্ষা পেল জাতীয় সম্মান।
পুরস্কার বিতরণীর পরদিন ভোরের এক স্নিগ্ধ চিত্র। শচীন তখন সরকারি কাজে ব্যস্ত। দিল্লীর এক হোটেলের লবিতে ছোট্ট সারাকে কোলে নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন অঞ্জলি। তাঁর ইচ্ছে, সংবাদপত্রে ব্র্যাডম্যানের পাশে শচীনের সেই ঐতিহাসিক ছবিটি দেখা। কিন্তু হোটেলের সংবাদপত্রের ডেলিভারি তখনো আসেনি।
ছোট্ট সারাকে নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন ফুটপাতের খবরের কাগজের দোকানের খোঁজে। দিল্লীর এক রাস্তার ধারের দোকানে যখন সংবাদপত্রটি মেলে ধরলেন, তখন পাশ থেকে আধো-আধো কণ্ঠে সারা বলে উঠল, ‘বাবা… বাবা…’।

দোকানি অবাক হয়ে সারা আর অঞ্জলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী আশ্চর্য ম্যাডাম! শচীনকে এখন এই ছোট ছোট বাচ্চারাও চিনে ফেলেছে!’ সেই সাধারণ দোকানদার ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি শচীনের হৃদয়ের অর্ধাঙ্গিনী এবং তাঁর কোলে থাকা শিশুটি খোদ শচীনেরই রক্ত।
শচীন মাঠে যখন একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছেন, অঞ্জলি তখন নিঃশব্দে বুনে গিয়েছেন সাফল্যের কার্পেট। দিল্লীর সেই অচেনা দোকানির বিস্ময় আসলে এক অমর মহাকাব্যের ক্ষুদ্রতম অংশ। শচীন যদি হন মাঠের প্রদীপ্ত ঈশ্বর, অঞ্জলি তবে সেই প্রদীপের সলতে। যিনি নিজে আড়ালে থেকে আজীবন আলোকিত করেছেন ক্রিকেট রাজ্যের রাজার রাজপথকে।










