আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলেছিলেন অনেক আগেই। না, কোনো গার্ড অব অনার ছিল না। ছিল না কান্নাভেজা গ্যালারি কিংবা শেষবারের মতো ব্যাট তুলে ধরা কোনো রাজকীয় মুহূর্তও। শুধু একটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট, আর তাতেই থেমে গিয়েছিল মাহেন্দ্র সিং ধোনি নামের আন্তর্জাতিক অধ্যায়। তবে আন্তর্জাতিকের পালা চুকে গেলেও সরব উপস্থিতি ছিল ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে(আইপিএল)। সেখানেও বয়স এসে বাগড়া দিয়েছে তবে চেন্নাই সুপার কিংস ধোনিকে ছেড়ে দেওয়ার সাহসটা দেখায়নি। এর পেছনে রয়েছে লাভ-ক্ষতির এক বিশাল পরিসংখ্যানের পাতা।
ধোনি তো কখনোই শুধু একজন ক্রিকেটার ছিলেন না। তিনি একটা আবেগ, একটা ভিন্ন পরিচয়, একটা ফ্র্যাঞ্চাইজির পুরো অস্তিত্ব। তাই তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার পর থেকেই প্রতি আইপিএলের প্রতি মৌসুমে একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে—’এবারই কি শেষ?’
সময় অবশ্য থেমে থাকেনি। বয়সের ভারে ব্যাটিংয়ের ধার কিছুটা কমেছে, ফিটনেসেও এসেছে সীমাবদ্ধতা। আগের মতো পুরো ম্যাচে প্রভাব রাখতে পারেন না তিনি। ২০২৪ সালের পর থেকে নিয়মিত পূর্ণ ম্যাচ খেলতেও দেখা যায়নি। কখনো ইমপ্যাক্ট সাব, কখনো সীমিত উপস্থিতি, তবুও চেন্নাই ধোনিকে ছেড়ে দিতে পারেনি। কারণ, ধোনিকে হারানো মানে শুধু একজন ক্রিকেটারকে হারানো নয়। ধোনিকে হারানো মানে চেন্নাইয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়টাকেই হারিয়ে ফেলা।
চেন্নাইয়ের হলুদ জার্সির সঙ্গে ধোনির সম্পর্কটা এতটাই গভীর যে, ফ্র্যাঞ্চাইজিটির জনপ্রিয়তার বিশাল অংশজুড়েই রয়েছে তাঁর ফ্যানবেজ। মাঠের গ্যালারি থেকে শুরু করে জার্সি বিক্রি, ব্র্যান্ড ভ্যালু থেকে শুরু করে বৈশ্বিক পরিচিতি, সবখানেই ধোনির ছাপ স্পষ্ট। হুট করেই যদি সেই নামটা হারিয়ে যায়, তাহলে আবেগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক দিক থেকেও বড় ধাক্কা খেতে পারে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। আর ঠিক সেখানেই চেন্নাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করে রেখেছে।

ধোনির ছায়াতলে থেকেই তারা খুঁজছিল নতুন একজন মুখ। এমন কাউকে, যিনি ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির পরবর্তী আইকন। নেতৃত্বের ব্যাটনও তাই ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে তাঁর হাত থেকে। যেন পরিবর্তনটা হঠাৎ না লাগে, যেন ভক্তরাও ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। সেই নতুন আইকনের খোঁজ ইতিমধ্যেই পেয়েছে চেন্নাই। নামটা সাঞ্জু স্যামসন।
ধোনির মতো বিশাল ফ্যানবেজ হয়তো নেই তাঁর। কিন্তু সাঞ্জুর মধ্যে চেন্নাই দেখছে অন্যরকম সম্ভাবনা। দক্ষিণ ভারতেরই ছেলে সাঞ্জু। তাই তো স্থানীয় আবেগের সঙ্গে সংযোগ, শান্ত স্বভাবের নেতৃত্ব আর দীর্ঘমেয়াদে দলকে এগিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য, সব মিলিয়ে তাঁকে ভাবা হচ্ছে ভবিষ্যতের মুখ হিসেবে।
হয়তো ধোনির জায়গা কখনোই পুরোপুরি পূরণ হবে না। কারণ কিছু নাম শুধু ক্রিকেটার নয়, তারা একেকটা যুগ। তবে যুগ বদলানোর আগেই উত্তরসূরি খুঁজে নেওয়ার কাজটা খুব নীরবভাবেই শুরু করে দিয়েছে চেন্নাই।
আর সেই কারণেই, ধোনির বিদায়ের গল্পটা হয়তো এখন আর শুধু ‘শেষ কবে খেলবেন’ এই প্রশ্নে আটকে নেই। বরং সেটি ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে—’ধোনির পর চেন্নাইকে কে বহন করবে?’ এই নতুন বাস্তবতায়। আর ধোনির শেষটা চেন্নাই সাজিয়ে রেখেছে নিখুঁত পরিকল্পনার ছকে।

আইপিএলের এবারের আসরটাই হয়তো ধোনির শেষ মঞ্চ। প্রথম ১১ ম্যাচের একটাতেও দেখা যায়নি ধোনিকে। তবুও তিনি আছেন দলটির ছায়া হয়ে। তবে সেটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। এভাবেই হয়তো ধীরে ধীরে মিলিয়েও যাবে সেই পাহাড়সম ছায়াটা। চেন্নাইয়ের আকাশ থেকে খসে যাবে সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা।










