ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে অমীমাংসিত ধ্রুপদী লড়াইটি কবজির মোচড় বনাম আঙুলের ভেল্কির। শেন ওয়ার্ন নাকি মুত্তিয়া মুরালিধরন – কে সর্বকালের সেরা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ক্রিকেটবিশ্ব দুই মেরুতে বিভক্ত। একদিকে সংখ্যাতত্ত্বের পাহাড়, অন্যদিকে শৈল্পিক আধিপত্য।
কাগজে-কলমে মুরালিধরন এক অপরাজেয় সম্রাট। ১৩৩ টেস্টে তাঁর ৮০০ উইকেটের বিপরীতে ১৪৫ টেস্টে ওয়ার্নের শিকার ৭০৮। মুরালির ২২.৭২ বোলিং গড়ের বিপরীতে উইকেট প্রতি ওয়ার্ন দিয়েছেন ২৫.৪২ রান। ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকারেও মুরালি যোজন যোজন এগিয়ে। পরিসংখ্যান বলছে মুরালিই রাজা, কিন্তু মহত্ত্ব কি কেবল সংখ্যায় মাপা যায়?
মুরালির সমালোচকদের তুরুপের তাস হলো বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ে। এই দুই দলের বিপক্ষে মুরালি নিয়েছেন ১৭৬ উইকেট, যেখানে ওয়ার্নের প্রাপ্তি মাত্র ১৭। এই তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষদের বাদ দিলে মুরালির বোলিং গড় দাঁড়ায় ২৪.৮৭ আর ওয়ার্নের ২৫.৪। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ বিচারে দুজনের লড়াইটা প্রায় সমানে-সমান।

শ্রীলঙ্কার স্পিন-স্বর্গে মুরালি যতটা ভয়ঙ্কর ছিলেন, অস্ট্রেলিয়ার পেস-বান্ধব উইকেটে ওয়ার্নও ছিলেন ততটাই কার্যকর। তবে বিদেশের মাটিতে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে ওয়ার্নই কিছুটা এগিয়ে। ঘরের বাইরে মুরালির বোলিং গড় যেখানে ২৭.৮, ওয়ার্নের মাত্র ২৪.৬১।
আরেকটি বড় প্রভাবক ছিল ‘সাপোর্ট’। ওয়ার্নের পাশে ছিলেন ম্যাকগ্রা-গিলেস্পির মতো শিকারিরা। পরিসংখ্যান বলে, লঙ্কানদের মোট উইকেটের ৪১ শতাংশ একাই নিয়েছেন মুরালি, যেখানে ওয়ার্নের অবদান ছিল দলীয় উইকেটের শতকরা ২৮ ভাগ। অর্থাৎ, মুরালি ছিলেন লঙ্কান বোলিংয়ের একমাত্র সূর্য, আর ওয়ার্ন ছিলেন এক নক্ষত্রখচিত আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।
এই দুই জাদুকরেরই একটি অভিন্ন দুর্বলতা ছিল ভারত। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের স্পিন খেলার সহজাত দক্ষতা দুজনের ক্যারিয়ারেই কালো দাগ ফেলেছে। ভারতের মাটিতে মুরালির গড় ৪৫ আর ওয়ার্নের ৪৩। অর্থাৎ দুজনেই সেখানে প্রায় একইভাবে কুপোকাত হয়েছেন। আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মুরালির ৭৫.৪২ গড় তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

শেষ পর্যন্ত এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইটা অনেকটা ব্যক্তিগত পছন্দের মতো। আপনি যদি পরিসংখ্যানের উপাসক হন, তবে মুরালি আপনার কাছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আর যদি ক্রিকেটের শৈল্পিকতা কিংবা প্রবল চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা খুঁজেন, তবে ওয়ার্নই আপনার নায়ক। ক্রিকেট যেখানে বরাবরই ব্যাটারদের নিয়ে একটু বেশিই আধিখ্যেতা করে, সেখানে বল হাতে তাদের এই মধুর দ্বৈরথে আক্ষরিক অর্থে কোনো পরাজিত নেই। জয় হয়েছে কেবল ক্রিকেটের।











