ক্রিকেট মাঠে বোলারের হাতের কারসাজি দেখে ব্যাটসম্যানরা সাধারণত বলের গতিবিধি পড়ে নেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষে এমন এক তরুণের আবির্ভাব ঘটেছিল, যার হাতের বল মাপার কোনো স্কেল ক্রিকেটীয় অভিধানে ছিল না।যার হাতের আঙুলের জাদুতে ছিল অমীমাংসিত এক রহস্য। নাম তার অজন্তা মেন্ডিস। কলম্বোর মোরাতুয়ায় জন্ম নেওয়া এই রহস্য বোলার ক্রিকেট বিশ্বকে এক অদ্ভুত ধাঁধার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন।
শ্রীলঙ্কান স্পিন ইতিহাসের মহীরুহ মুত্তিয়া মুরালিধরনের ক্যারিয়ার যখন গোধূলি লগ্নে, ঠিক তখনই লঙ্কান ক্রিকেটের আকাশে উদয় ঘটে মেন্ডিসের। ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রলয় ঘটিয়ে ২০০৮ সালে যখন জাতীয় দলে পা রাখলেন, তখন থেকেই শুরু হলো তার সংহারী রূপ।
বিশেষ করে ভারতের সেই সময়ের কিংবদন্তি ব্যাটিং লাইনআপ – শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষ্মণ কিংবা সৌরভ গাঙ্গুলী! মেন্ডিসের ‘ক্যারম বল’ আর টপ স্পিনের গোলকধাঁধায় তারা যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। অভিষেক টেস্ট সিরিজেই ২৬ উইকেট নিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি সাধারণ কেউ নন।

মেন্ডিসের উঠে আসার গল্পটা কোনো রাজকীয় বিলাসিতার নয়। শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক হিসেবে জীবনের লড়াই শুরু করেছিলেন তিনি। সেই শৃঙ্খলার ছাপ ফুটে উঠত তার বোলিংয়েও। তার হাতের তালুতে লুকানো থাকত আগামীর হাহাকার। প্রথাগত অফ স্পিনের ভিড়ে তিনি যেন নিয়ে এসেছিলেন ভিন্ন কিছু।
মেন্ডিসের পরিসংখ্যান আজও বিস্ময় জাগায়। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে মাত্র ১৯ ম্যাচে ৫০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়ে তিনি দ্রুততম বোলার হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন রেকর্ডের পাতায়। ১৯ টেস্টে ৭০ উইকেট আর ৮৭ ওয়ানডেতে ১৫২ উইকেট। এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় শুরুর দিনগুলোতে কতটা অপ্রতিরোধ্য ছিলেন তিনি।
মুরালিধরনের অবসরের পর লঙ্কান স্পিন আক্রমণের মূল কাণ্ডারি হওয়ার কথা ছিল তারই। কিন্তু নিজের তূণে নতুন কোনো অস্ত্র যোগ করতে না পারা এবং পুরনো ধার কমে যাওয়ায় মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতে বেশি সময় লাগেনি। যে দাপটে তিনি এসেছিলেন, সেই দাপট সময়ের সাথে ম্লান হতে থাকে। মুরালিধরনের ছায়া থেকে বের হয়ে যখন নিজে আলো ছড়ানোর কথা, ঠিক তখনই রঙ্গনা হেরাথের অভিজ্ঞতার কাছে হার মানতে হয় তাকে।

২০১৪ সালে শেষবারের মতো সাদা পোশাকে ও টি-টোয়েন্টিতে দেখা গিয়েছিল তাকে। আর ২০১৫ সালের পর ওয়ানডে থেকেও ছিটকে যান। যদিও বিভিন্ন সময় ঘরোয়া ক্রিকেটে লড়াই করে জাতীয় দলে ফেরার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু নির্বাচকদের রাডারে আর জায়গা হয়নি এই রহস্য মানবের।
মেন্ডিস আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, আকাশচুম্বী সাফল্য আর বিস্মৃতির অতল গহ্বরের দূরত্ব আসলে খুব সামান্য। ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় তিনি হয়ে থাকবেন এক চিরন্তন আক্ষেপের নাম। যিনি হতে পারতেন এক অমর মহাকাব্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থমকে গেলেন একটি ছোটগল্পের শেষ লাইনে।











