মায়াবী ঘূর্ণির রূপকার সাকলাইন

নব্বইয়ের সেই ধূসর ক্যানভাসে যখন পেসারদের গোলায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এক জাদুকরের আবির্ভাব ঘটল। যার আঙুলের কড়িতে লুকানো ছিল এক রহস্যময় বাঁশি। তিনি আর কেউ নন - সাকলাইন মুশতাক।

ক্রিকেট মাঠে অফ স্পিনারের আগমন মানেই একসময় ছিল সাদামাটা রক্ষণাত্মক বোলিংয়ের হাতছানি। কিন্তু নব্বইয়ের সেই ধূসর ক্যানভাসে যখন পেসারদের গোলায় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তখনই এক জাদুকরের আবির্ভাব ঘটল। যার আঙুলের কড়িতে লুকানো ছিল এক রহস্যময় বাঁশি। তিনি আর কেউ নন – সাকলাইন মুশতাক।

ক্রিকেট তপোবনে যখন অফ স্পিন ছিল স্রেফ রক্ষণাত্মক অস্ত্র, তখনই সাকলাইন এসে শেখালেন, আঙুলের মোচড়েও মহাকাব্য লেখা যায়। একই অ্যাকশনে বলকে উল্টো অভিমুখে ঘুরিয়ে দেওয়ার এক শিল্প। যাকে দুনিয়া চিনেছে ‘দুসরা’ নামে। তার সফল ও সার্থক রূপকার তিনি। নেটে দিনের পর দিন অমানুষিক পরিশ্রমে তিনি এই মারণাস্ত্র তৈরি করেছিলেন। মুরালিধরন কিংবা হরভজন সিংরা পরবর্তীতে এই পথে হাঁটলেও, আন্তর্জাতিক আঙিনায় এই জাদুর প্রথম প্রবর্তক হিসেবে সাকলাইনের নামই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

​সাকলাইনের ক্যারিয়ার যেন এক অসমাপ্ত কাব্য। মাত্র ৪৯টি টেস্টে ২০৮টি উইকেট – কোনো অংশেই তা সামান্য নয়। একদিনের ক্রিকেটের সীমিত পরিসরেও তিনি ছিলেন একচ্ছত্র সম্রাট। ১৬৯ ম্যাচে ২৮৮টি উইকেট শিকার করা এই বোলার দ্রুততম ১০০ থেকে ২৫০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন অবলীলায়। বিশ্বকাপে স্পিনার হিসেবে প্রথম হ্যাটট্রিকের কীর্তি আজও তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় বসিয়ে রেখেছে। ব্যাট হাতেও তিনি ছিলেন যথেষ্ট পটু, কিউইদের ডেরায় গিয়ে তাঁদেরই বিরুদ্ধে টেস্ট সেঞ্চুরি করা সাকলাইনের অলরাউন্ডার সত্তারই সাক্ষ্য দেয়।

সাকলাইনের ক্যারিয়ারের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় জুড়ে আছে ভারত। ১৯৯৯ সালের সেই অবিস্মরণীয় চেন্নাই টেস্টের কথা কি ভোলা যায়? চার ইনিংসে পাঁচটি করে মোট ২০টি উইকেট নিয়ে তিনি একাই গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতীয় দুর্গ। ক্রিকেটের ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকারকে তিনবার আউট করা। এ তো কোনো চাট্টেখানি কথা নয়!

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে চোটআঘাত, তৎকালীন তাঁর দলেই সেরা পেস আক্রমণের উপস্থিতি আর কিছু ভুল সাকলাইনের ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত করে দেয়। মুশতাক আহমেদের পর কিছুদিন টেস্টে পাকিস্তানের একমাত্র স্পিনার রূপে বিবেচিত হলেও দ্রুতই তাঁর জায়গা নিয়ে নেন লেগস্পিনার দানিশ কানেরিয়া। ২০০৩ বিশ্বকাপের দলে থাকলেও সেভাবে সুযোগ পাননি সাকলাইন।

২০০৪ সালে মুলতান টেস্টে বীরেন্দ্র শেবাগের সেই বিধ্বংসী ট্রিপল সেঞ্চুরির তোড়ে সাকলাইনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূর্য অনেকটা অকালেই অস্তমিত হয়। পিসিবি’র কঠোর সিদ্ধান্তে জাতীয় দলের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ক্রিকেট যার রক্তে, তাকে কি দূরে রাখা যায়? ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিয়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমালেও তিনি ফিরে এসেছেন কোচিংয়ের আঙিনায়।

সাকলাইন মুশতাক বাইশ গজের ইতিহাসে এক ঝরে পড়া শিউলি, যা ক্ষণস্থায়ী হলেও তার গন্ধ রয়ে গেছে ক্রিকেটের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মঈন খানের সেই ‘কামঅন সাক্কিইইই’ চিৎকার এখন আর স্টেডিয়ামে প্রতিধ্বনি তোলে না সত্য, কিন্তু ইতিহাসের কান পাতলে আজও শোনা যায় এক কিংবদন্তির পদধ্বনি। তিনি এমন এক মহাকাব্য, যার শেষ পাতাটি সময়ের নিষ্ঠুরতায় কেউ কোনোদিন পড়তে পারেনি, কেবল অনুভব করেছে।

লেখক পরিচিতি

ক্রীড়াচর্চা হোক কাব্য-কথায়!

Share via
Copy link