২০০৭ সালের ১৭ মার্চ। জ্যামাইকার সাবিনা পার্কে সেদিন শুধু পাকিস্তানের বিশ্বকাপ স্বপ্নই ধূলিসাৎ হয়নি, বরং ২২ গজের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতার বীজ বপন করা হয়েছিল। প্রতিপক্ষ যখন আয়ারল্যান্ডের মতো আনকোরা এক দল, তখন পরাজয়টা কেবল একটি পরিসংখ্যান ছিল না, ছিল এক অসহ্য লজ্জা। সেই লজ্জার ভার কাঁধে নিয়ে শেষবারের মতো মাঠ ছেড়েছিলেন এমন একজন মানুষ, যার মস্তিস্ক ক্রিকেটীয় ব্যাকরণকে দিয়েছিল আধুনিক রূপ। তিনি বব উলমার।
তবে এই ‘শেষবার’ শব্দটাতেই লুকিয়ে আছে এক আকাশ পরিমাণ রহস্য। ম্যাচ শেষে দু:খ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কিংসটনের জ্যামাইকা পেগাসাস হোটেলের ১২ তলায় ৩৭৪ নম্বর কক্ষে যান বব। ওভালের বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে ডোপ কেলেঙ্কারির ঝড় – সবকিছু থেকে আগলে রাখা প্রিয় দলটির এমন পতনে স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ বিষন্ন ছিলেন তিনি।
পরদিন ১৮ মার্চ, রবিবার। হোটেলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বার্নিস রবিনসন যখন দরজায় কড়া নাড়লেন, ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই যেন জগত স্তব্ধ হয়ে যায়। বাথরুমের হিমশীতল মেঝেতে পড়ে আছেন এক মহীরুহ। বিবস্ত্র দেহ, ঠোঁটের কোণে রক্তের রেখা আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা বমির দাগ – সে যেন এক বিভীষিকাময় ক্যানভাস। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা যখন তাকে মৃত ঘোষণা করলেন, ক্রিকেট বিশ্ব তখন শোকের চেয়ে বেশি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

প্রথমে ভাবা হয়েছিল, প্রবল মানসিক চাপ আর ডায়াবেটিসের ভার সইতে না পেরে হৃদযন্ত্র হয়তো তার ছন্দ হারিয়েছে। কিন্তু চার দিন পর জ্যামাইকান পুলিশের ডেপুটি কমিশনার মার্ক শিল্ডস যখন ঘোষণা করলেন যে, উলমারকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে, তখন ক্রিকেট বিশ্বের ভিত কেঁপে উঠেছিল।
গুঞ্জন আর ষড়যন্ত্রের ডালপালা মেলতে সময় লাগেনি। ম্যাচ-ফিক্সিং মাফিয়াদের কালো হাত, কোনো উন্মত্ত ভক্তের আক্রোশ, নাকি কোনো অপ্রিয় সত্য প্রকাশের আগেই তাকে স্তব্ধ করে দেওয়া নানা প্রশ্নে বিদ্ধ হতে থাকল বাতাস। পাকিস্তান দলের খেলোয়াড়দের অপরাধীর মতো কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো, কেড়ে নেওয়া হলো তাদের পাসপোর্ট।
তদন্তের জাল ছড়িয়ে পড়ল পুরো বিশ্বজুড়ে। কিন্তু যে প্যাথলজিস্ট ডক্টর ইরে সেশাইয়া খুনের দাবি করেছিলেন, তার যোগ্যতার জৌলুস ছিল ম্লান। যখন ব্রিটেন, দক্ষিণ আফ্রিকা আর কানাডার তিনজন বিশ্বসেরা ফরেনসিক পন্ডিত সেই মৃত্যুকে পুনরায় ব্যবচ্ছেদ করলেন, তখন খুনের তকমাটি মিথ্যে প্রমাণিত হলো। তারা রায় দিলেন – প্রকৃতিই তার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, কোনো মানুষ নয়।

২০০৭ সালের জুন মাসে মামলার ফাইল বন্ধ হলো বটে, কিন্তু সংশয়ের মেঘ কাটল না। নভেম্বর মাসের সেই দীর্ঘ ২৬ দিনের আদালত যেন ছিল এক মনস্তাত্ত্বিক কুরুক্ষেত্র। শেষ পর্যন্ত জুরিরা যে রায় দিলেন, তা সন্তুষ্টি দিতে পারল না কাউকেই। সেই অমীমাংসিত রায় আজও ঝুলে আছে ইতিহাসের পাতায়। তারা বলতে পারলেন না এটি খুন, আবার নিশ্চিতও করতে পারলেন না এটি স্বাভাবিক মৃত্যু।











