কয়েক রাত আগেও ক্রিকেটের নক্ষত্রমন্ডলীতে প্রফুল হিঙ্গে নামটি ছিল এক দূরবর্তী ধূমকেতুর মতো অচেনা ও অলক্ষিত। অথচ আইপিএল মঞ্চে প্রথমবারের মত যখন তিনি পা রাখলেন, তখন তার হাতের বল যেন হয়ে উঠল এক ঐশ্বরিক কলম, যা দিয়ে তিনি নতুন করে লিখলেন আইপিএলের ইতিহাস। বাবার খেরোখাতায় অঙ্কের হিসাব মিললেও, নাগপুরের সেই হিসাবরক্ষকের ছেলেটি আজ বাইশ গজে বিশ্বজয়ের এক অজেয় সমীকরণ লিখে দেখালেন।
প্রফুলের বেড়ে ওঠা এমন এক মধ্যবিত্ত গৃহকোণে, যেখানে পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের ভিড়েই ভবিষ্যৎ খোঁজা হতো। যখন তার বোন ক্যারিয়ার গড়ার তাড়নায় রাত জেগে প্রদীপের আলোয় মগ্ন থাকতেন, প্রফুল তখন ভোরের কুয়াশাকে চাদর বানিয়ে বেরিয়ে পড়তেন ব্যাট-বল হাতে। অদ্ভুত এক মায়ার বন্ধন ছিল সেই সংসারে। নিজের স্বপ্নকে একপাশে সরিয়ে রেখে বোনই তার ভাইকে নিয়ে যেতেন অনুশীলনের মাঠে।
মজার ব্যাপার হলো, প্রফুলের স্বপ্ন ছিল উইকেটের ওপারে দাঁড়িয়ে ব্যাট হাতে শাসন করা। কিন্তু ভাগ্যবিধাতা হয়তো অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। জহুরি বাবার চোখ ফাঁকি দিতে পারেননি তিনি। ছেলের হাতের কবজির মোচড় দেখে বাবা বুঝেছিলেন, এই ছেলে ব্যাটার নয়, গতির জাদুকর হতে জন্মেছে। বাবার সেই দূরদর্শী জেদই প্রফুলকে ঠেলে দেয় ফাস্ট বোলিংয়ের অগ্নিপরীক্ষায়।

সাফল্যের এই হিরন্ময় দ্যুতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি অসংখ্য ত্যাগের চিতাভস্ম থেকে জন্ম নেওয়া এক ফিনিক্স পাখি। ক্রিকেটের প্রতি প্রফুলের অনুরাগ ছিল এতটাই প্রখর যে, নিজের প্রিয় বোনের বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। উৎসবের আলোকসজ্জার চেয়ে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটই ছিল তার কাছে অধিক আরাধ্য।
ক্যারিয়ারের ঊষালগ্নেই এক মরণঘাতী পিঠের ইনজুরি তাকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল। সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও যখন হারিয়েছিলেন, তখন ক্রিকেট বিধাতা দূত হিসেবে পাঠালেন গ্লেন ম্যাকগ্রা এবং বরুণ অ্যারনকে। তাঁদের ছত্রছায়ায় ব্রিসবেনের মাটিতে চলল এক দীর্ঘ সাধনা। ব্যথাকে সখ্য বানিয়ে, চোটকে অলঙ্কার করে প্রফুল নিজেকে গড়ে নিলেন নতুন মূর্তিতে।
দীর্ঘ তিন বছরের উপেক্ষা আর ঘরোয়া ক্রিকেটের তপ্ত রোদে পুড়ে অবশেষে খুলেছিল ভাগ্যের দুয়ার। গত ম্যাচে যখন তিনি অভিষেক ওভারে বল করতে এলেন, তখন কেউ জানত না কী প্রলয় অপেক্ষা করছে।

আইপিএলের বর্ণাঢ্য ইতিহাসে অভিষেকে এমন অতিপ্রাকৃত সাফল্য আগে কেউ দেখেনি। যে ছেলেটি প্রচারের আলো থেকে যোজন যোজন দূরে ছিলেন, সেই অচেনা প্রফুলই এক ঝটকায় হয়ে উঠলেন ক্রিকেটীয় রূপকথার রাজপুত্র। চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিলেন টেবিল টপার রাজস্থানের ব্যাটিং লাইন আপ। তুলে নিলেন গোটা চারখানা উইকেট।
প্রফুল হিঙ্গে আজ কেবল সাধারণ একজন ক্রিকেটারের নাম নয়। তিনি এক অবিনশ্বর দর্শন। তিনি শিখিয়ে দিলেন, নিভৃত চার দেয়ালের ভেতর তিলে তিলে যে স্বপ্ন গড়া হয়, তা যদি নিষ্ঠার আগুনে পোড়ানো যায়, তবে একদিন তা গোটা বিশ্বের চোখ ধাঁধিয়ে দিতে বাধ্য।











