ফুটবল ইতিহাসের জঘন্যতম ম্যাচ

১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক চিলি এবং ইতালির মধ্যকার ম্যাচটি যেন ফুটবলের নিকৃষ্টতম অধ্যায়। যা আজ বিশ্বজুড়ে ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে পরিচিত।

ফুটবল মাঠের ঘাস সবুজ হওয়ার কথা, কিন্তু সেই বিকেলে তা রঞ্জিত হয়েছিল লাল রক্তে। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক চিলি এবং ইতালির মধ্যকার ম্যাচ। এ যেন ফুটবলের নিকৃষ্টতম অধ্যায়। যা আজ বিশ্বজুড়ে ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে পরিচিত।

​ম্যাচের আগেই যুদ্ধের দামামা বেজেছিল মাঠের বাইরে। দুই ইতালীয় সাংবাদিকের কলমে চিলির দারিদ্র্য আর অনগ্রসরতা নিয়ে চরম অবমাননাকর লেখা ছড়িয়ে পড়ে। যা চিলির জাতীয় চেতনায় আঘাত হানে। ম্যাচ শুরুর আগেই স্থানীয় সংবাদমাধ্যম যখন একে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করে। ৬৬ হাজার দর্শকের সামনে ফুটবলের চেয়েও বড় হয়ে উঠে প্রতিশোধ।

চিলির জন্য এই বিশ্বকাপ ছিল অস্তিত্বের লড়াই। ১৯৬০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হওয়া দেশটি তিলে তিলে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। তখন ইতালীয়দের তুচ্ছতাচ্ছিল্য ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। আয়োজনের নেপথ্য নায়ক কার্লোস ডিটবর্ন খেলা শুরুর মাসখানেক আগেই না ফেরার দেশে চলে যান। তার স্বপ্ন আগলে রেখেই মাঠে নামে চিলি।

বাঁশি বাজার ১২ সেকেন্ডের মধ্যেই শুরু হয় ফাউল। রেফারি কেন অ্যাস্টন বুঝে গিয়েছিলেন, আজকের দিনটি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন দিন হতে যাচ্ছে।

​খেলার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হাতাহাতি শুরু হয়। ইতালির জর্জিও ফেরিনিকে প্রথম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়। কিন্তু তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত চিলিয়ান পুলিশ এসে তাকে টেনে হিঁচড়ে মাঠ থেকে বের করেন। মাঠের পরিবেশ তখন রণক্ষেত্র।

সবচেয়ে কুখ্যাত দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হয় বিরতির ঠিক আগে। ইতালির মারিও ডেভিড চিলির লিওনেল সানচেজকে ফাউল করেন। সানচেজ তখন মেজাজ হারিয়ে সরাসরি বক্সারের মতো এক বিশাল ঘুষি বসিয়ে দেন ডেভিডের মুখে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, রেফারির সামনে এই কাণ্ড ঘটলেও চিলির হওয়ায় সানচেজকে কোনো সাজা পেতে হয়নি।

তবে কয়েক মিনিট পর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ডেভিড যখন সানচেজের মাথায় লাথি মারেন, তখন তাকেও মাঠ ছাড়তে হয়। নয় জনের ইতালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিলির উন্মত্ত ফুটবলাররা।

ম্যাচের ৭৩ মিনিটে হাইমে রামিরেজ এবং শেষ মুহূর্তে জর্জ তোরো গোল করে চিলির জয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু সেই জয়ের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল সেই কুৎসিত লড়াই। ম্যাচ শেষে বিবিসির কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার ডেভিড কোলম্যান একে বর্ণনা করেছিলেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নির্বোধ ও লজ্জাজনক প্রদর্শনী হিসেবে।

​চিলি সেবার তৃতীয় হয়ে আসর শেষ করেছিল, যা তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য। কিন্তু সান্তিয়াগোর যুদ্ধ ফুটবল বিশ্বকে শিখিয়েছিল এক তিক্ত পাঠ। ‘দ্যা বিউটিফুল গেইম’ খ্যাত ফুটবল যেন হয়ে উঠেছিল এক বীভৎস সংঘাতের মঞ্চ। সান্তিয়াগোর সেই সন্ধ্যা আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক অন্ধকার দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিশে আছে।

লেখক পরিচিতি

স্বপ্নীল ভূঁইয়া

সাব এডিটর

Share via
Copy link