সমালোচনার জবাব মুখে দেন না কোহলি!

২২ গজে পরিস্থিতি দলের বোলারদের বিপক্ষে হোক কিংবা খেলা একঘেয়ে লেগে গেলে বিরাটের প্রাণশক্তিই একা হাতে দলকে সজীব রাখে।

বাইরে থেকে মনে হয় তিনি যেন শান্ত সমুদ্রের মতো, কিন্তু ভেতরে বয়ে চলে এক অবাধ্য আগ্নেয়গিরি। বিরাট কোহলি ক্রিকেটের সেই মহাতারকা, যিনি বারবার বলেন বাইরের শোরগোল তাকে একদমই স্পর্শ করে না।

কিন্তু সত্যিই কি তাই? সত্যি হলো, নির্লিপ্ত মুখের নিচে লুকিয়ে আছে এক নরম হৃদয়, যা সমালোচনাকে কেবল শোনেনই না, বরং সেটাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে ফিরে আসেন আরও শক্তিশালী হয়ে। 

মাঠের লড়াই যতটা না ব্যাটে-বলের, তার চেয়েও বেশি মনের। সঞ্জয় মাঞ্জরেকারের অভিজ্ঞতায়, কোহলি সমালোচনার প্রতি দারুণ সংবেদনশীল। তিনি লক্ষ্য করেছেন, ভারতের অধিনায়কত্ব করার সময়ে যখনই বিরাটের পারফরম্যান্স নিয়ে কোনো নেতিবাচক কথা বলা হয়েছে, টসের সময়ে বিরাটের আচরণে যেন এক রহস্যময় শীতলতা দেখা যেত।

মাঞ্জরেকার বলেন, ‘বিরাট সেই প্রথম সারির মানুষদের একজন যে সবসময় বলে মানুষ কী বলছে তাতে আমরা গুরুত্ব দিই না, কিন্তু আদতে বিষয়টা উলটো।’

এই সংবেদনশীলতাই কোহলিকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে। সমালোচনা যেখানে অনেকের ক্যারিয়ারের সূর্যাস্ত ঘটায়, বিরাটের কাছে তা যেন ভোরের নতুন আলো। নেতিবাচক মন্তব্যগুলো কোহলিকে দমে যেতে দেয় না, বরং তাঁকে আরও ক্ষিপ্র করে তোলে।

মাঞ্জরেকারের মতে, ‘সমালোচনাগুলো বিরাটকে পরবর্তী বড় সেঞ্চুরিটা করার জন্য আরও বেশি উৎসাহিত করে।’ নিন্দুকের প্রতিটি কথা যেন তার ব্যাটে এসে আছড়ে পড়ে এক একটা বাউন্ডারির রূপে। অপমানের জবাবটা কোহলি মুখে না দিয়ে স্কোরবোর্ডে দিতে ভালোবাসেন।  

আইপিএলে এবারের মৌসুম বিরাটের জন্য যেন এক রোলারকোস্টার রাইড। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরুর হয়ে শুরুটা রাজকীয় ভঙ্গিতে করলেও, হঠাৎ করেই যেন ছন্দপতন। লখনৌ সুপার জায়ান্টস এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে পরপর দুটি ডাক তাঁকে কিছুটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে।

তবে ইতিহাসে দেখা যায়, কোহলির রাজকীয় প্রত্যাবর্তন সবসময়ই শুরু হয় এমন কোনো ধ্বংসস্তূপ থেকে। ২২ গজে পরিস্থিতি দলের বোলারদের বিপক্ষে হোক কিংবা খেলা একঘেয়ে লেগে গেলে বিরাটের প্রাণশক্তিই একা হাতে দলকে সজীব রাখে।

মাঞ্জরেকার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘অধিনায়ক হিসেবে তাঁর যে বিষয়টি ভালো লাগত তা হলো যখন পরিস্থিতি একদম নিস্তেজ হয়ে পড়ত তখনও সে নিশ্চিত করতো দল যেন অনুপ্রাণিত থাকে।’

বিরাটের অধিনায়কত্বের ধরণ ছিল এক অনন্য সংক্রামক শক্তির মতো। তিনি কেবল নিজে লড়তেন না, সতীর্থদের ধমনিতে ছড়িয়ে দিতেন লড়াকু মানসিকতা। মাঞ্জরেকারের ভাষায়, ‘বিরাট কোহলির অধীনে প্রতিটি খেলোয়াড়কে বিরাটের মতোই হতে হতো।’

আগ্রাসন আর একাগ্রতার সেই অদ্ভুত সংমিশ্রণ ভারতীয় ক্রিকেটকে বিদেশের মাটিতে জিততে শিখিয়েছিল। ক্রিকেট মাঠের গ্ল্যাডিয়েটর কোহলি প্রমাণ করেছেন যে, সমালোচক থাকা জরুরি। কারণ, সেই বাইরের আওয়াজগুলোই তাঁকে মনে করিয়ে দেয় তিনি কে আর তাঁর গন্তব্য কোথায়।

বিরাটের এই যাত্রা কেবল রানের জয়োগান নয়, বরং বারবার ভেঙে গিয়ে উঠে দাঁড়ানোর এক মহাকাব্য। সমালোচনার কাঁটা মাড়িয়েই তিনি বারবার প্রমাণ করেন, কেন তাকে ক্রিকেট বিশ্বের কিং বলা হয়।

লেখক পরিচিতি

বেঁচে আছি না পড়া বইগুলো পড়ব বলে

Share via
Copy link