বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যখন জ্বলে ওঠে বিপদের লাল সংকেত, তখনই যেন অন্য এক রূপে আবির্ভাব হয় লিটন দাসের। দল যখন ধ্বংসস্তূপে, ড্রেসিংরুমে যখন আতঙ্ক বিরাজমান, তখন ব্যাট হাতে বাংলাদেশের শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ান তিনি। লিটন যেন বাংলাদেশের দুঃসময়ের বন্ধু।
তার ক্যারিয়ারের সেরা টেস্ট ইনিংসগুলোর দিকে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায় গল্পটা। এগুলো কেবল রান নয়, এগুলো সংকটের ভিতর দাঁড়িয়ে দলকে টেনে তোলার মহাকাব্য।
২০২১ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ যখন ১০৯ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে, তখন লিটনের ৯৫ রানের ইনিংস দলকে পৌঁছে দেয় ৪৬৮ রানে। কয়েক মাস পর চট্টগ্রামে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪৯ রানে চার উইকেট অবস্থায় নেমে খেলেন ১১৪ রানের অবিস্মরণীয় ইনিংস।
এরপর নিউজিল্যান্ড সফরে দেখা যায় আরও পরিণত এক লিটনকে। মাউন্ট মঙ্গানুইতে ২০৩ রানে চার উইকেট হারানো অবস্থায় নেমে খেলেন ৮৬ রানের এক প্রতিরোধী নক। ক্রাইস্টচার্চে নেমে শতক হাঁকানো ইনিংসটা যে কেউ একবাক্যে স্বীকার করবেন, ওটা লিটনের ক্যারিয়ার সেরা। কঠিন কন্ডিশনে সেই ইনিংসগুলোই বাংলাদেশের লড়াইয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিল।

কিন্তু লিটনের ‘ক্রাইসিস ম্যান’ পরিচয় সবচেয়ে বড় হয়ে ধরা দেয় ২০২২ সালের মিরপুর টেস্টে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশ তখন ২৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে কার্যত শেষ। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লিটন খেলেন ১৪১ রানের অনবদ্য এক ইনিংস।
লিটনের ক্লাস বর্ণনার জন্য ২০২৪ সালের রাওয়ালপিন্ডি টেস্টকেও বেছে নেওয়া যেতে পারে। ২০ রানে চার উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ তখন ধুঁকছে। পাকিস্তানি পেসাররা ছুড়ছেন আগুনের গোলা, কিন্তু সেই আগুনের মাঝেই লিটনের ব্যাট থেকে বের হয় ১৩৮ রানের মহাকাব্য। যা বদলে দিয়েছিল পুরো সিরিজের চিত্র।
গলে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯০, মিরপুরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ১২৮, এমন প্রায় প্রতিটি বড় ইনিংসেই দেখা গেছে একই দৃশ্য। লিটন নামছেন তখনই, যখন দল চাপে। আর সেই চাপ থেকেই বাংলাদেশকে টেনে তুলছেন নিজের ব্যাটে।
সিলেটেও গল্পটা বদলায়নি। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ যখন ১০৬ রানে চার উইকেট হারিয়ে ফেলেছে, তখন আবারও দায়িত্ব তুলে নিলেন লিটন। খেললেন ১২৬ রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস, যেখানে যেমন ছিল ধৈর্য আর সাহস, তেমনই ছিল ক্লাস আর সংকট সামলানোর বিরল ক্ষমতা।

লিটন দাস যে মানের ব্যাটার, কাগজ-কলমের পরিসংখ্যানে সেই মানের বর্ণনার দৃশ্যায়ন হয় না। লিটনের ক্লাস দু-চোখে তৃপ্তি এনে দেয়, বিপদের দিনে বুঝিয়ে যায়, এই লিটন সবার থেকে আলাদা। কারণ বড় ব্যাটসম্যান অনেকেই হন, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে নিজের কাঁধে পুরো ইনিংস তুলে নেওয়ার ক্ষমতা সবার থাকে না। তাই তো এক কথায় তাঁর বিশেষণ টানলে বলতে হয়, লিটন দাস বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ‘ক্রাইসিস ম্যান’।
Share via:










