এই এক শট নিয়ে ফুটবলবোদ্ধাদের মনে মুগ্ধতা আর দর্শকদের মনে বিস্ময়ের কমতি নেই। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রকে কাজে লাগিয়ে নেওয়া রবার্তো কার্লোসের ব্যানানা কিক যেন শিল্পের এক শ্রেষ্ঠ চিহ্ন। ১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের বিপক্ষে নেওয়া সেই অতিপ্রাকৃতিক ফ্রি-কিকটি ফুটবল আর বিজ্ঞানের এক কাব্যিক মেলবন্ধন হয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের মনে।
কিন্তু এই জাদুকরী শটের পেছনের মানুষটি কে ছিলেন? এই রবার্তো মার্লোস সাও পাওলোর এক দরিদ্র কৃষকপুত্র। যিনি ধুলোমাখা মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে স্বপ্ন বুনতেন ফুটবল নিয়ে। পকেটে টাকা না থাকলেও ইচ্ছের কোনো কমতি ছিল না। বাল্যকালে উনিয়াও সাও জোয়াও ক্লাবের স্কাউটের নজরে পড়েন। ডাক পান ক্লাবে যাওয়ার। অর্থের অভাবে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে ক্লাবে পৌঁছে যাওয়া সেই ছেলেই আজ বিশ্ব ফুটবলের ‘দ্য বুলেটম্যান’।
সাড়ে তিনশো বছর আগে স্যার আইজ্যাক নিউটনের করা পর্যবেক্ষণ এবং শত বছর পরে আবিষ্কৃত ‘ম্যাগনাস এফেক্ট’ সেদিন জীবন্ত হয় কার্লোসের বুটে। ৩৫ গজ দূর থেকে নেওয়া প্রচণ্ড গতির শটটি বাতাসে বায়ুচাপের তারতম্য তৈরি করে। যা অবিশ্বাস্যভাবে বাঁক খেয়ে ফরাসি গোলরক্ষক ফাবিয়ান বার্থেজকে চেয়ে চেয়ে দেখতে বাধ্য করে।

রক্ষণভাগ সামলানোই ছিল যাদের কাজ, কাফুর সাথে জুটি বেঁধে রবার্তো কার্লোস সেই রক্ষণাত্মক ফুলব্যাক পজিশনে নিয়ে এলেন ‘ওভারল্যাপিং’-এর এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব। উইং ধরে তাঁর সেই গতি আর বুলেটের মতো বাঁকানো ওভারল্যাপগুলোতে বারবার খড়কুটোর মতো ভেঙে পড়েছে প্রতিপক্ষ। জাতীয় পর্যায়ে আর্জেন্টিনা হোক কিংবা ক্লাব পর্যায়ের ইন্টার মিলান, এসব শক্তিশালী দলগুলোর সুসংগঠিত রক্ষণভাগের জন্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে আসতেন কার্লোস।
রিয়াল মাদ্রিদের সোনালী ইতিহাসের অন্যতম এই কারিগর জায়গা করে নিয়েছেন সর্বকালের সেরাদের মধ্যে। তাঁর বিদায়ের পর মার্সেলো এসে কিছুটা শূন্যতা পূরণ করলেও, কার্লোসের সেই অতিমানবীয় কিকের গতি আর নিখুঁত নান্দনিকতা আজীবন অধরাই রয়ে গেছে। ফুটবল যদি সত্যিই কোনো শিল্প হয়, তবে কার্লোস ছিলেন সেই ক্যানভাসের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি।
পেলে, গ্যারিঞ্চা কিংবা রোনালদো নাজারিওর মতোই কার্লোসও ব্রাজিলের গলি থেকে রাজপথে উঠে আসা সংগ্রামের এক অপরাজেয় সৈনিক। আমাজনের স্রোতের মতোই বয়ে চলা সাম্বা ফুটবলের এই উপাখ্যান চিরকাল জীবন্ত থাকবে। আর কার্লোসের সেই অমর ব্যানানা কিকটি আজীবন প্রমাণ করে যাবে, বিশ্বের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারের বাঁ পায়ে কতখানি ঐশ্বরিক মহিমা লুকিয়ে ছিল।











