দ্য হোমসিক নাম্বার নাইন

২০০৬ সালে সব ধরনের ফুটবলকে বিদায় জানানো অ্যালান শিয়েরার স্রেফ ফুটবলের নিছক কোনো চরিত্র নন। তিনি স্বয়ং একটি ইতিহাস! যাঁর ছোঁয়ায় ক্রীড়াঙ্গনের সৌন্দর্যকে ফুটবল দেবতা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন লাখো কোটি ভক্ত-অনুরাগীর হৃদয়ে!

ফুটবল দুনিয়ায় অর্থের অনবরত প্রবাহ, স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনযাপন কিংবা যশ-খ্যাতির স্পর্শ যে কারোরই পরম আরাধ্য বিষয়। কিন্তু অ্যালান শিয়েরার সেই কাতারে পড়েন না। গৃহকাতর বা ‘হোমসিক’ শিয়েরার তাই নিজ শহরের ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডের নাম্বার নাইন জার্সি পরে করে গেছেন গোলের পর গোল, গড়েছেন রেকর্ডের পর রেকর্ড।

অবশ্য ফুটবলে শিয়েরারের শুরুটা ছিল খানিকটা আক্ষেপে মোড়া! শৈশব থেকেই যে নিউক্যাসল ইউনাইটেডে নয় নম্বর জার্সি পরে খেলার স্বপ্নে বিভোর, সেই দলটিতেই খেলার জন্য ট্রায়াল দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটি, ওয়েস্টব্রমউইচ অ্যালবিয়নও ফিরিয়ে দেয় তাঁকে।

তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় সাউদাম্পটনে ট্রায়াল দেওয়ার পর। ইউড পার্কে সেই বছরই থিতু হন শিয়েরার। সাউদাম্পটনের হয়ে ১৯৮৮ সালে প্রিমিয়ার লিগে চেলসির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচটা রাঙাতে না পারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে স্বমহিমায় জ্বলে ওঠেন ১৯৭০ সালের ১৩ আগস্ট গসফোর্থে জন্মানো এই ফরোয়ার্ড। হেভিওয়েট প্রতিপক্ষ আর্সেনালের বিপক্ষে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই হ্যাটট্রিক করে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি!

ইনজুরির ধাক্কা, হঠাৎ ফর্ম হারানোসহ সব মিলিয়ে ১৫৮ ম্যাচে ৪৩ গোল করে সাউদাম্পটন অধ্যায় চুকান এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড। তবে এই সময়ের ভেতরেই নিচে নেমে সুযোগ তৈরি এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণের গ্যাপ খুঁজে বের করার কৌশল ভালোভাবে রপ্ত করেন তিনি। যা ধীরে ধীরে তাঁকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা ‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে গড়ে তোলে।

১৯৯২ সালে ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের মধ্যে রেকর্ড ৩.৬ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে তাঁকে কিনে নেয় ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স। নতুন ক্লাবে সূচনাটা দুর্দান্তভাবে করেন শিয়েরার। মৌসুমের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৬ গোল করলেও, চোটের কবলে পড়ে মৌসুমের বাকিটা মিস করেন তিনি।

পরের মৌসুমেই ফের স্বরূপে আবির্ভূত হন। সেবার ৩১ গোল করে ‘প্লেয়ার অব দ্য সিজন’-এর মুকুট জিতে নেন তিনি। ব্ল্যাকবার্নও হয় দ্বিতীয়।

 

এরপর আসে শিয়েরারের ক্যারিয়ারের মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৯৯৪-৯৫ মৌসুম। মৌসুমজুড়ে ব্ল্যাকবার্নের আক্রমণভাগে ক্রিস সাটনের সঙ্গে ঐতিহাসিক ‘এসএএস’ জুটি গড়ে তোলেন তিনি। ৩৪ গোল করে দীর্ঘ ৮০ বছর পর ব্ল্যাকবার্নকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এনে দেন তিনি। এটাই তাঁর ক্যারিয়ারের একমাত্র বড় ট্রফি। সঙ্গে জেতেন গোল্ডেন বুটও। পরের বছর ধারাবাহিকতা ধরে রেখে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে প্রিমিয়ার লিগে টানা তিন মৌসুমে ৩০ গোল করার নজির গড়েন শিয়েরার।

এমন পারফরম্যান্সের কারণে রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো জায়ান্টদের নজরে আসেন তিনি। কিন্তু গন্তব্য হিসেবে শেষ পর্যন্ত ওল্ড ট্র্যাফোর্ড ও সান্তিয়াগো বার্নাব্যু ছেড়ে সেন্ট জেমস পার্ককেই বেছে নেন গসফোর্থবাসীর ঘরের ছেলে শিয়েরার! রেকর্ড ১৫ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফিতে স্বপ্নের ক্লাব নিউক্যাসলে পাড়ি জমান তিনি। গায়ে জড়ান তাঁর ছেলেবেলার ম্যাগপাইজ হিরো কেভিন কিগার, হিউজি গ্যালাচার, ম্যালকম ম্যাকডোনাল্ডদের ঐতিহাসিক নয় নম্বর জার্সি!

ব্যস! তারপর থেকেই ইতিহাসে শিয়েরার ও নিউক্যাসল নাম দুটো এসে মেলে এক বিন্দুতে! টানা ১০ মৌসুম নিউক্যাসলে কাটিয়ে চারবারই প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার অনবদ্য রেকর্ড গড়েন তিনি। আক্ষেপ শুধু একটাই—দ্য ম্যাগপাইজদের হয়ে মেজর কোনো শিরোপা জেতা হয়নি তাঁর। ১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে নিউক্যাসলকে লিগে রানার্সআপ করা আর দুবার ইংলিশ এফএ কাপের ফাইনালে তোলা, গসফোর্থের ক্লাবটির হয়ে অর্জন তাঁর এতটুকুই।

ইংল্যান্ডের জার্সিতেও অনবদ্য খেলেছেন শিয়েরার। ১৯৯৬ সালের ইউরো কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন তিনি। দেশের হয়ে ৬৩ ম্যাচে ৩০ গোল তাঁর। প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি।

২০০৬ সালে সব ধরনের ফুটবলকে বিদায় জানানো অ্যালান শিয়েরার স্রেফ ফুটবলের নিছক কোনো চরিত্র নন। তিনি স্বয়ং একটি ইতিহাস! যাঁর ছোঁয়ায় ক্রীড়াঙ্গনের সৌন্দর্যকে ফুটবল দেবতা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন লাখো কোটি ভক্ত-অনুরাগীর হৃদয়ে!

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

গোল-আকালের অবসান ঘটাবেন রোনান!

বয়সভিত্তিক ফুটবলে রোনান সুলিভান অবশ্য নিজের সামর্থ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০২৬ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের পথে পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন তিনি। ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারেও গোল করেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। কৌশলগতভাবে রোনানকে কার্যকর করে তুলতে প্রয়োজন উইং থেকে নির্ভুল ক্রস, মাঝমাঠ থেকে থ্রু পাস এবং আক্রমণের শেষ তৃতীয়াংশে দ্রুত বল সরবরাহ। প্রতিপক্ষ নিচু ব্লকে রক্ষণ সাজালে বক্সে তাঁর পজিশনিং ও ফিনিশিং গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যদিকে, প্রতিপক্ষের প্রেসিং মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্রুত পাসিং, বলের দখল ধরে রাখা এবং রক্ষণ থেকে আক্রমণে কার্যকর উত্তরণ।

আফগান ঘূর্ণির মায়াজালে ধরাশায়ী হবে মিরাজ-রাজারা?

তবে স্পিনের লড়াইয়ে বাংলাদেশকেও খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। দুই বছরের ওয়ানডে পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের স্পিনাররা শিকার করেছেন মোট ৮২টি উইকেট। যদিও চলতি বছরে ১২ ম্যাচে স্পিন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ২৬ উইকেট, ২০২৫ সালে ১১ ম্যাচে রিশাদ, মিরাজ, তানভীর, নাসুমদের শিকার ছিল ৫৬ উইকেট। গত বছর বাংলাদেশের অধিকাংশ ম্যাচেই স্পিন সহায়ক উইকেট থাকলেও চলতি বছরে দলটি খেলেছে তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে। ফলে কন্ডিশনের সহায়তা পেলে বাংলাদেশের স্পিনাররাও যে প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে বিপর্যয় নামিয়ে আনতে সক্ষম, তার ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই। রিশাদ হোসেনের আক্রমণাত্মক লেগ স্পিন, মেহেদী হাসান মিরাজের নিয়ন্ত্রিত অফ স্পিন, তানভীর ইসলামের বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে নতুন সংযোজন রহস্য স্পিনার আলিস আল ইসলাম। বৈচিত্র্য আর কৌশলের সমন্বয়ে প্রতিপক্ষকে মরণকামড় দিতে মরিয়া থাকবে বাংলাদেশও।

Share via
Copy link