২০২৭ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোচিং ব্যবস্থায় দেশীয়দের ওপরই বড় ভরসা রাখতে যাচ্ছে বিসিবি। প্রধান কোচ ফিল সিমন্স বিদেশি হলেও সহকারী কোচিং স্টাফের বড় অংশ এখন দেশের। মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, মোহাম্মদ আশরাফুল, তালহা জুবায়ের ও আশিকুর রহমান মজুমদার চারজনই বাংলাদেশি। স্পিন কোচ হিসেবে আছেন পাকিস্তানের মুশতাক আহমেদ। আর বিসিবি এখন আরও একজন বিদেশি সহকারী কোচ খুঁজছে বলে জানা যাচ্ছে।
অর্থাৎ, বড় কোনো পরিবর্তন না হলে এই কাঠামো নিয়েই ২০২৭ বিশ্বকাপের দিকে এগোবে বাংলাদেশ।
দেশি কোচদের সুযোগ দেওয়া নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং দেশের কোচদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, জাতীয় দলের মতো জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কি শুধু দেশি কোচদের ওপর নির্ভর করাই সঠিক পথ?

অতীতের অভিজ্ঞতা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশের জাতীয় দলে দেশি কোচরা বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পেয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সাফল্যের উদাহরণ খুব বেশি নেই। সম্প্রতি মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের দায়িত্বের সময়টাও সেই প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। আশরাফুল যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যাটিং বিভাগে তার ভূমিকা ছিল। অথচ ওই সময়েই বাংলাদেশের ব্যাটিং সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে।
অবশ্য একজন কোচের সাফল্য বা ব্যর্থতা মাপার নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই। তাই পুরো দায় একজনের ওপর চাপানোও ঠিক হবে না। কিন্তু কোচের দায়িত্বের সময় দলের পারফরম্যান্স কেমন ছিল, সেটাও তো মূল্যায়নের একটি বড় জায়গা। সেই জায়গা থেকে সালাউদ্দিনের সাম্প্রতিক সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যখন কোনো নির্দিষ্ট বিভাগে বড় উন্নতি দেখা গেছে, সেখানে বিদেশি কোচদের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের উন্নতির সময় রাসেল ডমিঙ্গো ও অটিস গিবসনের কাজ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরে অ্যালান ডোনাল্ড ও শন টেইট সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছেন। ব্যাটিংয়েও নিল ম্যাকেঞ্জির সময় বাংলাদেশকে বেশ গোছানো দল হিসেবে দেখা গেছে।

সেখানেই বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে একটা পার্থক্য চোখে পড়ে। বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশ বড় মানের বিদেশি ব্যাটিং কোচ পাচ্ছে না। এর মধ্যে দলের ব্যাটিং নিয়ে ধারাবাহিক সমস্যাও তৈরি হয়েছে। ফলে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরীক্ষিত বিশেষজ্ঞদের জায়গা কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছি?
আরেকটি বিষয় নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বর্তমান কোচিং স্টাফের কয়েকজনের মধ্যে পুরোনো ক্রিকেটীয় সম্পর্ক রয়েছে। তালহা জুবায়ের, আশিকুর রহমান ও মোহাম্মদ আশরাফুল একই বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন। সেই দলের সঙ্গে ছিলেন নাফিস ইকবাল খানও, যিনি এখন জাতীয় দলের ম্যানেজার।
এটা কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। একই প্রজন্মের সাবেক ক্রিকেটারদের পরবর্তী সময়ে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু যখন কোচ নিয়োগের স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড সামনে থাকে না, তখন পরিচিতি ও যোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে করা হচ্ছে—এই প্রশ্ন উঠবেই।

দেশি কোচদের সুযোগ দেওয়া দরকার। তাদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতাও তৈরি করতে হবে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় জাতীয় দলকে পরীক্ষাগার বানানো কতটা নিরাপদ, সেটাই আসল প্রশ্ন।
২০২৭ বিশ্বকাপ সামনে রেখে বাংলাদেশের হাতে খুব বেশি সময় নেই। এই সময়ে কোচিং স্টাফ বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আবেগ, পরিচিতি বা দেশি-বিদেশি পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট দায়িত্বে ফল দেওয়ার রেকর্ডের।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা দেশি কোচ বনাম বিদেশি কোচের নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জাতীয় দলের জন্য এই মুহূর্তে কোন সমন্বয়টা সবচেয়ে বেশি কার্যকর হবে। যদি ভালো মানের বিদেশি বিশেষজ্ঞ পাওয়া যায়, তাহলে শুধু দেশি কোচদের সুযোগ দেওয়ার জন্য তাদের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে কেবল বিসিবির কাছেই মিলবে সেই প্রশ্নের উত্তর!












