রাজাউল্লাহর গল্পটি কোনো দৈববাণী ছিল না, ছিল না কোনো রাজকীয় রক্তচক্ষুর সংকেত। ছিল কেবলই এক নির্জন নি:শব্দতা ভাঙার ইতিহাস। যখন পাকিস্তানের ক্রিকেট আকাশ ঢেকে গিয়েছে চরম হতাশার ঘন মেঘে, তারকাদের চেনা আলো তখন ফিকে, ঠিক তখনই এক অচেনা নাম কুয়াশা চিরে সামনে এলো – রাজাউল্লাহ।
ঘরোয়া ক্রিকেটের স্যাঁতসেঁতে পাতা ঘেঁটে তাকে খুঁজে নেওয়া কোনো হিসেবী সিদ্ধান্ত ছিল না, তা ছিল এক অন্ধকারের বুকে আলো জ্বালানোর ব্যাকুল চেষ্টা। তাঁর বোলিংয়ের প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে থাকা সেই সুপ্ত সম্ভাবনাই হয়ে উঠলো ভবিষ্যতের বীজ।
ফোনের ওপারে থাকা নিরবতা সেদিন হয়তো কোনো উদাসীনতা ছিল না, ছিল এক নতুন মহাকাব্য রচনার নীরব প্রস্তুতি। নির্বাচকদের রিংটোন যখন কোনো জবাব পেল না, তখন গ্রামের কাঁচা মাটির ভিটায় পৌঁছালো রাজকীয় বার্তা।

এক রাতের ব্যবধানে ভিসা, তাড়াহুড়ো করে হাতে নেওয়া পাসপোর্ট – আর তারপরই অচেনা এক পাখির মতো ডানা মেলে বিলাতের মেঘলা আকাশে উড়ে যাওয়া। কিসের কোনো ভূমিকা, কিসের কোনো প্রস্তুতি, সে তো সরাসরি রূপকথার মূল পাতায় পা রেখেছিল!
তারপর এডজবাস্টনের সবুজ ক্যানভাসে লাল রঙের তুলিতে লেখা হলো তাঁর রূপকথা। সবুজ ঘাসের ওপর তাঁর প্রথম আক্রমণেই স্তব্ধ হয়ে গেল প্রতিপক্ষের দম্ভ। শিকার? এ লাল বলের ক্রিকেটে যুগের সবচেয়ে অপরাজেয় ক্রিকেট সৈনিক। জো রুট!
এরপর ১৪৪ কিলোমিটারের তীব্র গতিতে ইমিলিও গের স্টাম্প উড়িয়ে দেওয়া কিংবা একে একে স্মিথ ও রবিনসনকে সাজঘরে ফেরানো! একই ইনিংসে চার উইকেট তুলে নিয়ে সে জানান দিল, এই ছেলে শুধু উড়তে আসেনি, আকাশ ছিনিয়ে নিতে এসেছে।

কিন্তু নাটকের আসল আবেশ তখনো বাদ্যযন্ত্রের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল। প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে পড়ে পাকিস্তান যখন ফলো অনের তেতো বিষ গিলছে, ঠিক তখনই বল হাতে আগুন ঝরানো সেই কাণ্ডারী হাতে তুলে নিল কাঠের তলোয়ার।
৬৩ বলে চারটি চারের পাশাপাশি নয়টি মহাজাগতিক ছক্কায় সাজানো তার ৮১ রানের এক বিধ্বংসী ঝোড়ো কাব্য! ১২৮.৫৭ স্ট্রাইক রেটের সেই খুনে তাণ্ডবে পাকিস্তান কেবল ফলো অনের অভিশাপ থেকেই মুক্ত হলো না, প্রতিপক্ষের চোখের সামনে ছুঁড়ে দিল ১২৯ রানের এক নাটকীয় লিড।
এই ৮১ রানের মহাকাব্যিক তণ্ডব শুধু দলকেই বাঁচায়নি, নতুন করে লিখেছে টেস্ট ক্রিকেটের ধূসর পাণ্ডুলিপি। পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে টেস্ট অভিষেকে লোয়ার অর্ডারে সর্বোচ্চ রানের রাজমুকুট এখন তার মাথায়। আর গ্যালারির ওপর দিয়ে বল ভাসিয়ে দেওয়ার সেই উন্মাদনায় সে স্পর্শ করেছে বিশ্বরেকর্ড। অভিষেক টেস্টেই নয়টি ছক্কার অবিশ্বাস্য নজির!

যে ছেলেটির গ্রামের ভিটায় ডাক পৌঁছাতে লোক পাঠাতে হয়েছিল, যে তাড়াহুড়ো করে পাসপোর্ট হাতে বিমানে চেপেছিল আজ সে-ই দাঁড়িয়ে আছে এজবাস্টনের বুকে এক অনন্য রূপকথার নায়ক হয়ে। রাজাউল্লাহর এই পদার্পণ কোনো সাধারণ আত্মপ্রকাশ নয়। এ যেন ধূলিকণার বুক চিরে এক নিমেষে আকাশ ছোঁয়া কোনো অমর মহাকাব্য!











