রোনালদিনহো ছিলেন সেই বিরল জাদুকর, যিনি চরম শত্রুর রক্তচক্ষুকে মুহূর্তেই ভালোবাসার করতালিতে রূপান্তর করতে পারতেন। ফুটবল ইতিহাসে অনেক মহাতারকা এসেছেন ট্রফির পাহাড় আর গোলের পরিসংখ্যান গড়তে, কিন্তু রোনালদো দে আসিস মোরেইরা কেন সবার চেয়ে আলাদা – সেই প্রশ্নের উত্তর জড়িয়ে আছে তাঁর খেলার নিজস্ব দর্শনে।
আজকের ফুটবল যখন জিপিএস ট্র্যাকার, কঠোর গাণিতিক কৌশল আর অতিরিক্ত পেশাদারিত্বের শৃঙ্খলাবদ্ধ এক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে, সেখানে রোনালদিনহো ছিলেন ফুটবলের শেষ বিশুদ্ধ আনন্দ।
২০০৫ সালের সেই রূপকথার রাতের কথাই ধরা যাক, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে তাঁর জোড়া গোলের পর বার্সেলোনার ঐতিহাসিক শত্রুরাও দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে বাধ্য হয়েছিল। শতাব্দীর প্রাচীন ঘৃণা আর অহংকার এক নিমেষে ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল ওই চিরচেনা হাসির তোড়ে। ফুটবল মাঠের সবুজ গালিচায় এমন অবিশ্বাস্য জাদু আর কে দেখাতে পেরেছে?

বল পায়ে রোনালদিনহো মানেই ছিল চরম দু:সাহস ও কল্পনার মেলবন্ধন। মুখে নিষ্পাপ হাসি ঝুলিয়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে ‘ইলাস্টিকো’ ট্রিক্সে বোকা বানানো, বিপরীত দিকে তাকিয়ে অকল্পনীয় ‘নো-লুক’ পাস কিংবা ২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যানকে স্তব্ধ করে দেওয়া সেই দূরপাল্লার অলৌকিক ফ্রি-কিক!তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল এক একটি প্রেমের কবিতা। বার্সেলোনা যখন ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে, তিনি একা হাতে শুধু ক্লাবটিকে জেতাননি, শিখিয়েছিলেন জেতার মাঝে আনন্দ কতটা গভীর হতে পারে।
এই মানুষটি আলাদা ছিলেন তাঁর রাজকীয় উদারতাতেও। বার্সেলোনার রাজসিংহাসনে বসে নিজের অহংকার বিসর্জন দিয়ে এক লাজুক কিশোরকে পরম স্নেহে নিজের পিঠে তুলে নিয়েছিলেন। যাকে বিশ্ব আজ লিওনেল মেসি বলে চেনে। নিজের মুকুট হস্তান্তর করার এমন সুন্দর দৃশ্য ক্রীড়াবিশ্বে সত্যিই বিরল।
এমনকি পতনের অন্ধকার গল্পেও রোনালদিনহো অনন্য। জীবনের নিয়মহীনতা পেরিয়ে যখন প্যারাগুয়ের ধূসর কারাগারে বন্দী হতে হলো, ফুটবল সেখান থেকেও তাঁকে দূরে রাখতে পারেনি। কয়েদিদের টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জেলখানার ধুলোবালিতে দাঁড়িয়েও সেই একই মুক্তোঝরা হাসিতে ট্রফি তুলে নিয়েছিলেন।

আসলে, ফুটবল যখন শুধুই জিততে চাওয়া এক কঠিন গাণিতিক লড়াই, রোনালদিনহো তখন জালের ভেতর বল পাঠানোর চেয়ে প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে একটু হাসাতে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি জিতেছেন ঠিকই, কিন্তু জয়ের আত্মঅহংকার তাঁকে কখনো স্পর্শ করেনি।
অন্য খেলোয়াড়দের পা থেকে বল কেড়ে নিলে তারা ক্ষিপ্ত হয়, আর রোনালদিনহোর পা থেকে বল কেড়ে নিলে মনে হতো একজন জাদুকরের হাত থেকে টুপিটা হঠাৎ পড়ে গেছে। তিনি ফুটবলকে বিজয়ের কোনো যুদ্ধের ময়দান বানাননি, বানিয়েছিলেন এক মাতাল করার মতো খেয়ালি অর্কেস্ট্রেটর, যার সুর থামার পর থেকে যায় শুধুই এক মায়াবী স্তব্ধতা।











