ক্লাব পর্যায়ে এমন কোনো শিরোপা নেই, যার স্পর্শ তিনি পাননি! অথচ, জাতীয় দলে নিজেকে কখনো মেলে ধরার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর। তিনি যেন এক প্রথাবিরুদ্ধ শিল্পী, যিনি ফুটবলের সবুজ গালিচায় লিখে গেছেন এক অমোঘ আলো-আঁধারির গল্প! তিনি ফরাসি স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা।
২০০৯ সালে বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে থিতু হওয়া এই তারকা বছরের পর বছর ধরে স্প্যানিশ জায়ান্টদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেবা দিয়ে গেছেন। কিন্তু, বিতর্ক, ক্ষোভ আর অভিবাসন রাজনীতির বেড়াজাল ফ্রান্স জাতীয় দল থেকে বারবার দূরে ঠেলে দিয়েছে সময়ের সেরা এই স্ট্রাইকারকে।
আলজেরীয় বংশোদ্ভূত বেনজেমা স্রেফ প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’ স্ট্রাইকারদের মতো ডি-বক্সের ভেতরে ওঁৎ পেতে থাকতে পছন্দ করতেন না। বিশ্ব ফুটবলের এক নিখুঁত ‘ফলস-নাইন’ হিসেবে নিয়মিত নিচে নেমে বল রিসিভ, ড্রিবলিং, আর ঝোড়োগতির টার্নের কারিকুরিও দেখাতেন তিনি। পাশাপাশি, তার অনন্য ফুটবলীয় দর্শন ও পাসিং অ্যাকিউরেসি সতীর্থদের জন্য গোল করার পথ খুলে দিত।

ক্লাব ফুটবলে করিম বেনজেমার ট্রফি এবং রেকর্ডের খাতা এককথায় বিস্ময়কর। ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক লিওঁর জার্সিতে ২০০৫ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত টানা চারটি লিগ ওয়ান শিরোপা জিতে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পাড়ি জমান তিনি। এরপর ক্লাবটিতে ৬০০-রও বেশি ম্যাচ খেলে তিনি করেন ৩৫৪টি গোল এবং ১৬৫টি অ্যাসিস্ট।
ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় রোনালদোর ঠিক পরেই তাঁর অবস্থান। লস ব্ল্যাঙ্কোসদের জার্সিতে তিনি জিতেছেন রেকর্ড ২৫টি মেজর শিরোপা।
এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, চারটি লা লিগা এবং চারটি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে ক্লাব পর্যায়ে অনবদ্য পারফরম্যান্স করে বেনজেমা জিতে নেন স্বপ্নের ‘ব্যালনের ডি’অর’ ও উয়েফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের সম্মান।

অথচ, ক্লাব ফুটবলের এই অভাবনীয় সাফল্যের বিপরীতে বেনজেমার জাতীয় দলের অধ্যায়টা শুধুই বিষাদে ভরা! তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বারবার হোঁচট খেয়েছে বিতর্কের অভিঘাতে।
কখনো ফ্রান্সের অভিবাসনবিরোধী নীতির কারণে দল থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ, আবার কখনো ব্যক্তিগত কোন্দলের জেরে নিষেধাজ্ঞা—বেনজেমাকে দেশের জার্সিতে থিতু হওয়ার তেমন সুযোগই দেয়নি। এমনকি ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ বাদে তিনি দেশের হয়ে খেলেননি আর কোনো বিশ্বকাপও!
বেনজেমার ক্যারিয়ার প্রথম ধাক্কা খায় ২০১৫ সালে তাঁর জাতীয় দলের সতীর্থ ম্যাথিউ ভ্যালবুয়েনাকে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ওঠায়। এতে লা ব্লুজদের জার্সিতে পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা পান তিনি। যা তাঁর ২০১৮ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নকে চুরমার করে দেয়।

এ ছাড়া, বেনজেমা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন বলে অভিযোগ তোলেন দেশটির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী এবং কয়েকজন সিনেটর। এটি তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরার পথকে আরও জটিল করে তোলে। অবশ্য, বেনজেমা ২০২২ সালের ফ্রান্সের ৩০ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াডে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু, উরুর চোটে সেবারও কপাল পোড়ে তাঁর!
বিতর্কের এসব ডামাডোলে পড়ে শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান বেনজেমা। দেশের হয়ে ৯৭ ম্যাচে ৩৭টি গোল ও ২০টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। ২০২১ সালের উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জয়ই তাঁর জাতীয় দলের একমাত্র অর্জন।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হওয়া সত্ত্বেও করিম বেনজেমা রয়ে গেছেন এক ট্র্যাজিক মহাকাব্যের নায়ক হয়ে! আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তেমন বড় কোনো সাফল্য অধরা থেকে গেলেও ক্লাব পর্যায়ে রিয়ালের জার্সিতে সম্ভাব্য সব শিরোপার ভাগিদার হয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন বিতর্ক আর সমালোচনার ঘেরাটোপ উৎরাতে নিজের অদম্য মনোবল আর পরিশ্রমই যথেষ্ট!











