জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসে বাংলাদেশ ক্রিকেট যেন থেমে থাকার সুযোগই পায়নি। এইচপি, ইমার্জিং আর এ দল মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন প্রায় ৬৩ জন ক্রিকেটার, একের পর এক দল সাজাতে গিয়ে নির্বাচকেরা ঘরোয়া ক্রিকেটের একদম গভীর পর্যন্ত হাতড়েছেন, আনকোরা মুখ ডাক পেয়েছে, কাউকে আবার স্বল্প নোটিশে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটতে হয়েছে। এত বড় আয়োজনের ভিড়ে শুধু একটা নাম কোথাও নেই, আকবর আলী।
২৪ বছর বয়সী এই কিপার-ব্যাটার ২০২০ সালে বাংলাদেশকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন, গত বছর কাতারে এশিয়া কাপ রাইজিং স্টার্সে দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর অভিজ্ঞতা যেকোনো সমবয়সীর চেয়ে দীর্ঘ। অথচ এই পুরো সময়টা তাঁর কেটেছে ইংল্যান্ডে ক্লাব ক্রিকেট খেলে, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সফরসূচির মাঝখানে একজন পরিচিত অধিনায়কের এভাবে হাওয়া হয়ে যাওয়াটা চোখ এড়ানোর মতো ব্যাপার ছিল না।
ফর্মের হিসাব টানলে সিদ্ধান্তটাকে একেবারে অমূলক বলা যাবে না। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ৯ ইনিংসে তাঁর রান ২১৭, গড় ২৪.১১, চোখ কপালে তোলার মতো সংখ্যা এটা নয়। তবে গত এপ্রিলে বিসিএলে উত্তরাঞ্চলের হয়ে ১২১ রানের ইনিংস, রংপুরকে ঘরোয়া ক্রিকেটের জোড়া শিরোপা জেতানো অধিনায়কত্ব, এসব তো আছেই। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে না যে তাঁকে দলে রাখতেই হবে, কিন্তু অন্য কিপার-ব্যাটাররা যখন সুযোগের পর সুযোগ পাচ্ছেন, তখন প্রতিটি দল থেকে আকবরের বাদ পড়াটা যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে।

প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার একসময় বলেছিলেন, আকবর জাতীয় দলের পরিকল্পনায় আছেন, তাহলে একসঙ্গে এতগুলো দল বিদেশে পাঠানোর সময় পরিকল্পনায় আকবর আড়ালে রয়ে গেলেন কীভাবে? এর কোনো উত্তর মেলেনি।
উত্তরের এই শূন্যতায় জায়গা করে নিয়েছে গুঞ্জন। আকবর ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। জানা যায়, ক্রিকেটারদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনায় সংগঠনের ভেতরে মতবিরোধ হয়েছিল, নির্ভরযোগ্য কয়েকজন ক্রিকেটারের মতে কিছু নীতিগত বিষয়ে আকবর ভিন্নমত দিয়েছিলেন, যা প্রভাবশালী কর্তারা ভালোভাবে নেননি। এমন খবরও চাউর হয়েছে যে কয়েকটি সফরের প্রাথমিক তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও পরে অলিখিত কারণে তা ছেঁটে ফেলা হয়। এসবের কোনোটাই প্রমাণিত নয়, সবই বাতাসে ভেসে বেড়ানো গুঞ্জন।
সম্প্রতি আকবরের দেখা পাওয়া যায় এনসিএলের সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে আকবর কৌশলী অবস্থান নিয়ে এমন ষড়যন্ত্র এর খবর উড়িয়ে দিয়েছেন, কারও দিকে আঙুল তোলেননি, তবে সব সফর থেকে বাদ পড়ার কষ্টটা বিনাবাক্যে স্বীকার করেছেন।

তবে এর মাঝেই সুখবর এলো নেপাল থেকে! এনপিএলের তৃতীয় আসরে কর্ণালি ইয়াকস তাঁকে দলে নিয়েছে, আকবরের প্রথম ডাক বিদেশী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে। ঘোষণাটাও ছিল নাটকীয়, নিজেদের প্রমো তে খেলোয়াড়ের নাম না বলে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি সামাজিক মাধ্যমে দিয়েছে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ট্রফির পাশে ব্যাটিং ও উইকেটকিপিংয়ের সরঞ্জামের ছবি, আর ছবিটাই বলে দিয়েছে কে আসছেন। যদিও এর একদিন পর আকবর সহ অফিসিয়াল ভিডিও আসে। ৮৬ টি-টোয়েন্টিতে ১ হাজার ১৮০ রান নিয়ে তিনি নামবেন সেখানে, একই আসরে পোখারা অ্যাভেঞ্জার্সের হয়ে খেলবেন সাকিব আল হাসানও।
গত তিন মাসে দেশের প্রায় প্রতিটি স্কোয়াডে যাঁর নাম ছিল না, অন্য এক দেশ তাঁকে ডেকে নিল সেই ট্রফির ছবি দিয়েই, যেটা তিনি এনে দিয়েছিলেন এই দেশকেই।
নেপালের এই ডাক আকবরের জন্য সুখবর, সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে প্রশ্নটা শেষ হয়ে যায় না। ক্রিকেটাররা আড়ালে যা বলছেন তা যদি সত্যি হয়, অর্থাৎ ভিন্নমত প্রকাশ করলে ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই ভয়ে খেলোয়াড়েরা যদি মুখ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন, তাহলে সমস্যাটা আর আকবর আলীর একার থাকে না, গিয়ে ঠেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পুরো কাঠামোগত সংস্কৃতিতে। রান করা যায়, ট্রফি জেতা যায়, কিন্তু যে ড্রেসিংরুমে মুখ খোলার আগে দুবার ভাবতে হয়, সেখানে শেষ পর্যন্ত হেরে যায় খেলাটাই।












