শুরুটা হয়েছিল একটা কাগজের টিস্যুতে, শেষটা হলো একটা নোটবুকের পাতায়। মাঝখানের পথটুকু ফুটবলের ইতিহাস! ২০০০ সালে বার্সেলোনার কর্মকর্তা কার্লেস রেক্সাচ তেরো বছরের এক ছেলেকে টিস্যুতে লিখে দিয়েছিলেন চুক্তির প্রতিশ্রুতি, আর সেই ছেলেটাই ২১ বছর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন নোটবুকের পাতায় নিজের হাতে লিখে।বর্তমানে সবকিছু যখন ক্যামেরা, কনটেন্ট আর পিআরের হিসাবে চলে, তখন এই মানুষটা কলম তুলে নিলেন, নিজ হাতে লিখলেন নিজের জার্নি নিজের আবেগ আর বিদায়ের গল্প। এই নিজস্বতাটুকুই তাঁকে সবার থেকে আলাদা করে রেখেছে।
টিস্যু থেকে নোটবুকের মাঝখানে যা ঘটেছে, তার পুরো তালিকা লিখতে গেলে লেখক ক্লান্ত হবেন,সাথে দর্শকও, তবু তালিকা ফুরোবে না।ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনায় কাটিয়েছেন নিজের সেরা সময়, তারপর পিএসজি হয়ে ইন্টার মায়ামি, যেখানে সবাই ভেবেছিল ধীরে ধীরে নিভে যাবেন তিনি, অথচ রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে তিনি এমনভাবে খেলতে থাকলেন যেন নাম আর বয়স বাদ দিয়ে শুধু পরিসংখ্যান শুনলে যে কেউ বলবে কোনো টগবগে তরুণের কথা হচ্ছে।
আর আর্জেন্টিনার জার্সিতে যা দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, ১৮ বছর বয়সে অভিষেক, খেলেছেন ছয়টি বিশ্বকাপ। কিন্তু এই পথটা কখনোই সহজ ছিল না। মেসি যেদিন প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে নামলেন, সেদিন থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু স্বপ্নের পিছু পিছু এলো একের পর এক হতাশা।

২০১০ সালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে হেরে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়, ২০১৪ সালে ফাইনালে সেই জার্মানির কাছেই হেরে শূন্য হাতে ফেরা, আর কোপা আমেরিকাতেও আসেনি সাফল্য, ২০১৫ আর ২০১৬ সালে পরপর দুই ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৬ সালের ওই হারের পর রাগ আর ক্ষোভের মাথায় তিনি অবসরের ঘোষণা দিয়ে ফেললেন, যদিও কয়েক মাস পরই ফিরে এলেন দলে।
২০১৭ সালে ইকুয়েডরের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে একাই দলকে পৌঁছে দিলেন বিশ্বকাপে, কিন্তু ২০১৮ সালে সেই একই হতাশা, ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হেরে শেষ ষোলোতেই বিদায়। ২০১৯ সালে কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে হারের পর যেন মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে গিয়েছিল, জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির আর ট্রফি জেতা হবে না। মুখে মুখে সমালোচনা, অনেকের চোখে এত বর্ণিল ক্যারিয়ারের গায়ে লেগে থাকা একটা কলঙ্কের দাগ।
অথচ এই ব্যর্থতার ভেতরেই যেন নি:শব্দে তৈরি হচ্ছিলেন মেসি, এতগুলো বছরের বঞ্চনা আস্তে আস্তে পুড়িয়ে তাঁকে বানিয়ে তুলছিল খাঁটি সোনা। আর সেই নিখাদ মেসি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে শুরু করলেন, প্রথমে ২০২১ সালে এলো কোপা আমেরিকা, আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের ট্রফিখরা কাটিয়ে, তারপর এলো ফিনালিসিমা, আর তারপর এলো সেই রাত, ২০২২ সালের কাতার, যেদিন ৩৬ বছরের অপেক্ষা শেষ হলো আর পুরো আর্জেন্টিনার সঙ্গে পুরো বিশ্বের ভক্তদের অপেক্ষার প্রহর ফুরোলো। যেন সেই বিশ্বকাপও অপেক্ষায় ছিলো মেসির হাতে ওঠার।

বিশ্বকাপ হাতে ওঠার পর সর্বকালের সেরা কে, এই তর্কটাও যেন আস্তে আস্তে থেমে গেল। আট বার ব্যালন ডি’অর, ক্যারিয়ারে ৯০০ গোল করে রোনালদোর পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ওই ক্লাবে নাম লেখানো, বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুই বার গোল্ডেন বল জেতা, আর যে ট্রফিটা তাঁর ঝুলিতে নেই বলে সমালোচকেরা সবচেয়ে বেশি আঙুল তুলতেন, সেই দেশের ট্রফিও যখন একের পর এক এসে জমল, তখন আর বলার মতো কিছু বাকি থাকল না।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও তিনি দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারলেন স্পেনের কাছে। মাঠ ছাড়ার সময় চোখের জল আটকে রাখা মেসিকে দেখে তখনই অনেকের মনে হয়েছিল, এটাই হয়তো শেষ।
হয়েছিলও তাই। ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই, নোটবুকের পাতায় তিনি লিখে ফেলেছিলেন বিদায়ের কথা, কিন্তু প্রকাশ করেননি। এরপর ৮ আগস্ট চলে গেলেন তাঁর বাবা হোর্হে মেসি। ৩১ আগস্ট সেই লেখা ইনস্টাগ্রামে এলো, আর সঙ্গে মেসি জানালেন, বাবাকে হারানোর পর সিদ্ধান্তটা নিয়ে তিনি আরও নিশ্চিত। লিখলেন, ‘আমি শপথ করে বলছি, আমি সবসময় নিজের সবটুকু দিয়েছি।’ আরও লিখলেন, “সময় আর বেশি নেই, আর বিভিন্ন অধ্যায় শেষ হয়ে আসছে।’

যে মানুষ যুগের পর যুগ পায়ের জাদুতে একটা পুরো দেশকে বেঁধে রেখেছিলেন, তিনি গল্পের শেষটাও লিখলেন সবচেয়ে সাদামাটা ভাষায়, এবং সেটাই সবচেয়ে বেশি বুকে লাগলো। এবার আর্জেন্টিনার পালা তাঁকে বিদায় দেওয়ার। বুয়েনস আইয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’, যেখানে জেতা-হারার কোনো হিসাব সেখানে নেই, নেই কোনো শিরোপার চাপ। আছে শুধু একটা শহর, একটা দেশ, আর নীল-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ নাচ। গ্যালারিতে যারা থাকবেন, তাঁদের অনেকে ফুটবল চিনেছেন মেসিকে দেখেই। সেই রাতে বল গড়াবে, মেসি ছুঁয়ে দেখবেন প্রতিটা বল, আর প্রতিটা স্পর্শে গ্যালারি জানবে, এই দৃশ্য আর ফিরবে না।
টিস্যু থেকে নোটবুক পর্যন্ত এই যাত্রায় মেসি আমাদের শিখিয়েছেন, বিশ্বজয়ের পথটা কত নি:শব্দে শুরু হতে পারে, আর কত নি:শব্দে শেষ হতে পারে। বিদায়টা হয়তো কখনোই সহজ হয় না, তবু এমন একটা ক্যারিয়ার, আনন্দ , অশ্রু আর অকৃত্রিম অনুভুতি উপহার দেওয়ার জন্যে জন্য ভক্তরা সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন।











