ডাবল সেঞ্চুরির সিংহাসন শুধুই ভারতের!

একটা সময় ডাবল সেঞ্চুরি ছিল কঠিনতম স্বপ্ন। এখন সেটা ভারতের কাছে প্রায় পরিচয়ের মতো হয়ে গেছে, আর বাকি দুনিয়া তাকিয়ে আছে সেই পরিচয়ের দিকে, অপেক্ষায় আছে কেউ কি কখনো এই দলটাকে ধরতে পারবে।

একসময় ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি ছিল অনেক দুরের এক দেওয়াল। ক্রিকেট খেলা শুরুর প্রায় ৩৯ বছর পর্যন্ত কেউ ওই দেয়ালটা ভাঙতে পারেননি, সেটা শুধু রানের হিসাব ছিল না, মাথার ভেতরের একটা সীমানাও ছিল। ৫০ ওভারে একজন একা ২০০ করবে, এই ভাবনাটাই তখন বাড়াবাড়ি মনে হতো। তারপর গোয়ালিয়রের এক ফেব্রুয়ারির বিকেলে শচীন টেন্ডুলকার ১৪৭ বলে অপরাজিত ২০০ করে সেই দেয়ালে প্রথম ফাটলটা ধরালেন।

ফাটলটা দিয়ে আলো ঢুকল, আর সবচেয়ে আগে সেটা দেখল ভারত। দেড় বছরও গেল না, ইন্দোরে বীরেন্দর শেওয়াগ ১৪৯ বলে ২১৯ করে ফেললেন, ২৫টা চার আর ৭টা ছক্কায়। শেওয়াগের কাছে বোলার বলে আলাদা কিছু ছিল না, তিনি বল দেখতেন আর মারতেন। এরপর এল রোহিত শর্মার সময়, ২০১৩ সালে বেঙ্গালুরুতে ২০৯, তারপর কলকাতার ইডেনে ১৭৩ বলে ২৬৪, ৩৩টা চার আর ৯টা ছক্কা। আজও ওয়ানডের কোনো ইনিংস ওই সংখ্যার ধারেকাছে নেই। ২০১৭ সালে মোহালিতে আবার অপরাজিত ২০৮। একজন মানুষ তিনবার ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। এটা কি ভাগ্যের ব্যাপার নাকি ক্রিকেটীয় শ্রেষ্টত্ব সেই তর্ক থেকেই যাবে।

কিন্তু এই জায়গাতেই ভারতের আসল গল্পটা। ডাবল সেঞ্চুরি এখানে কোনো দুর্ঘটনা নয়, একটা ধারা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামে ইশান কিশান নেমেই এমনভাবে খেললেন যেন তাঁর হাতে সময় খুব কম। ১২৬ বলে ২০০ পূর্ণ করলেন, যা তখন পর্যন্ত ওয়ানডের দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরি। তার কয়েক সপ্তাহ পরই হায়দরাবাদে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুবমান গিল করলেন ২০৮। বয়স তখন মাত্র ২৩, আর খেলার ধরনে কোনো ভয় নেই, কোনো দ্বিধা নেই। একটা প্রজন্ম যেন শিখে এসেছে যে ১৫০ হলো মাঝপথ, গন্তব্য আরও দূরে।

আর এই তো সদ্য, ৩০ সেপ্টেম্বর, গুয়াহাটিতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ৪০৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অধিনায়ক গিল খেললেন অপরাজিত ২২৩। ১৩৩ বলের ইনিংস, ২৬টা চার আর ৮টা ছক্কা। ২০০ ছুঁলেন মাত্র ১১৭ বলে, ভেঙে দিলেন নিজের দেশেরই ইশান কিশানের রেকর্ড। রেকর্ডটা এক ভারতীয় আরেক ভারতীয়ের কাছ থেকে নিয়েছেন, এর চেয়ে বড় ইঙ্গিত আর কী হতে পারে? ভারতের ভেতরেই এখন ডাবল সেঞ্চুরির প্রতিযোগিতা চলছে। গিল এখন রোহিতের পর দ্বিতীয় ব্যাটার যিনি ওয়ানডেতে একাধিক ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। সব মিলিয়ে ভারতের ঝুলিতে আটটা ডাবল সেঞ্চুরি।

বাকি পৃথিবীর হিসাব সেখানে পাঁচটা। ক্রিস গেইল ক্যানবেরায় বিশ্বকাপে ১৪৭ বলে ২১৫ করেছিলেন, ১৬টা ছক্কায়। মার্টিন গাপটিল ওয়েলিংটনে ১৬৩ বলে অপরাজিত ২৩৭ করেছিলেন, যা এখনও ওয়ানডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস। ফখর জামান বুলাওয়েতে ১৫৬ বলে অপরাজিত ২১০ করে পাকিস্তানের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হয়েছেন। গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ২০২৩ বিশ্বকাপে ওয়াংখেড়েতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে অপরাজিত ২০১ করেছিলেন, যখন অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ৭ উইকেটে ৯১। ক্র্যাম্পে পা নড়ছে না, তবু দাঁড়িয়ে থেকে ম্যাচটা ছিনিয়ে এনেছিলেন, আর ২০২৪ সালে পাল্লেকেলেতে পাথুম নিশাঙ্কা ১৩৯ বলে অপরাজিত ২১০ করে শ্রীলঙ্কার প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হয়েছেন।

এই পাঁচটা ইনিংস অসাধারণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, বাকিদের কাছে ডাবল সেঞ্চুরি এসেছে একটা বিস্ময়ের মতো, জীবনে একবার, কোনো এক বিশেষ দিনে।  প্রত্যেকে নিজের দেশের ইতিহাসে একটা আলাদা অধ্যায় লিখেছেন, কিন্তু সেই অধ্যায়ের পরে আর কোনো পাতা জোড়া লাগেনি। ভারতে ব্যাপারটা উল্টো, এখানে প্রতিটা ডাবল সেঞ্চুরি পরের জনকে বলে দিয়েছে, তুমিও পারবে। শচীন দেখিয়ে দিলেন, শেওয়াগ সেটাকে সাহসের উৎসব বানালেন, রোহিত সেটাকে অভ্যাসে পরিণত করলেন, আর ইশান ও গিল সেটাকে এমন গতি দিলেন যা আগে কল্পনাও করা যেত না।

তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? ব্যাটের মান বা শরীরের জোরে নয়, গেইল বা গাপটিলের জোরে কমতি ছিল না। পার্থক্যটা মনের ভেতরে, ভারতের ব্যাটাররা একটা সেঞ্চুরি করে থেমে যান না, কারণ তাঁরা জানেন তাঁদের আগের জন কোথায় গিয়ে থেমেছিলেন, আর সেই জায়গাটা পেরোনোই তাঁদের কাজ। এখানে একশো মানে শুরু, দেড়শো মানে থামা যাবেনা, আর দুশো মানে গন্তব্য। এই আক্রমণাত্মক মানসিকতা, সবসময় এগিয়ে থাকার তাড়না আর সেরাটা ছাড়া কিছুতে সন্তুষ্ট না হওয়ার জেদ ভারতকে বাকি পৃথিবী থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

একটা সময় ডাবল সেঞ্চুরি ছিল কঠিনতম স্বপ্ন। এখন সেটা ভারতের কাছে প্রায় পরিচয়ের মতো হয়ে গেছে, আর বাকি দুনিয়া তাকিয়ে আছে সেই পরিচয়ের দিকে, অপেক্ষায় আছে কেউ কি কখনো এই দলটাকে ধরতে পারবে।

লেখক পরিচিতি

আমজাদ হোসেন আবির

সাব এডিটর

Share via
Copy link