একটি বল। কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। তারপর বোলারের পা ক্রিজের বাইরে। আম্পায়ারের হাত প্রসারিত, ব্যাটিং দলের জন্য বাড়তি এক রান। যেটাকে বলা হয় নো বল! এমন দৃশ্য বাইশ গজে ঘটে হরহামেশাই। তবে হঠাৎ কেন বলছি এই কথা?
এই নো বলকে ঘিরেই রয়েছে ক্রিকেটের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়! কিন্তু সেই নো বল যদি আগে থেকেই ঠিক করা থাকে? বোলার যদি জানেন, কোন বলে তাঁকে ক্রিজের বাইরে পা ফেলতে হবে? আর এর পেছনে যদি থাকে কোটি টাকার বাজি!
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ২০১০ সালে লর্ডসে ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছিল। শুধু একটি নয়, পরপর তিনটি নো বলের পেছনে ছিল সাজানো পরিকল্পনা।

আর সেই ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানের তিন ক্রিকেটার, অধিনায়ক সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমির।
প্রায় ১৬ বছর আগের ঘটনা! ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্ট খেলছিল পাকিস্তান। এর আগে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড-এর সাংবাদিকেরা যোগাযোগ করেন পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে।
নিজেদের ধনী ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে তাঁরা জানতে চান, ম্যাচে নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটানো সম্ভব কি না। পুরো কথোপকথন গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছিল।

মাজিদ তাঁদের জানান, পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটারকে দিয়ে এমন কাজ করানো সম্ভব। এমনকি মোহাম্মদ আমির ও মোহাম্মদ আসিফ কখন নো বল করবেন, সেটিও আগেই জানিয়ে দেন। বিনিময়ে ছিল মোটা অঙ্কের অর্থ।
ম্যাচের ফলাফল বদলানোর প্রয়োজন ছিল না, নির্দিষ্ট একটি বলের ঘটনা আগে থেকে জানাই ছিল বাজির বাজারে অর্থ আয়ের জন্য যথেষ্ট। যাকে মূলত ক্রিকেটের ভাষায় বলা হয় স্পট ফিক্সিং!
ঘটনাও ঘটে ঠিক পূর্বাভাস অনুযায়ী। ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে নো বল করেন ১৮ বছর বয়সী আমির। এরপর দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে একই কাজ করেন আসিফ। পরে তদন্তে উঠে আসে, এই দুই নো বলের পাশাপাশি আরেকটি নো বলও পরিকল্পনার অংশ ছিল।

গোপন ভিডিও প্রকাশের পর বিশ্ব ক্রিকেটে তোলপাড় শুরু হয়। গ্রেপ্তার হন মাজহার মাজিদ। তদন্তের আওতায় আসেন তিন ক্রিকেটারও। শুরুতে তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তদন্তে পাওয়া প্রমাণ তাঁদের অবস্থান দুর্বল করে দেয়।
এই ঘটনার পরের মাসেই, ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আইসিসি তিন ক্রিকেটারকে সাময়িক নিষিদ্ধ করে। ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন ট্রাইব্যুনালের রায়ে সালমান বাটকে ১০ বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার পাঁচ বছর স্থগিত ছিল। আসিফ পান সাত বছরের নিষেধাজ্ঞা, যার দুই বছর স্থগিত। আর আমিরের নিষেধাজ্ঞা হয় পাঁচ বছর।
তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলেন আমির। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই গতি, সুইং ও নিয়ন্ত্রণে নজর কেড়েছিলেন এই বাঁহাতি পেসার। তাঁকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ তারকা ভাবা হতো।

আসিফ ছিলেন অসাধারণ সুইং বোলার, আর সালমান বাট ছিলেন দলের অধিনায়ক এবং ২০০৯ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য। প্রতিভা ও পরিচিতি কোনো কিছুই তাঁদের রক্ষা করতে পারেনি।
আইসিসির শাস্তির পাশাপাশি শুরু হয় ফৌজদারি বিচার। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে সালমান বাট ও আসিফ দোষী সাব্যস্ত হন। এর আগে আমির ও মাজহার মাজিদ নিজেদের দোষ স্বীকার করেন।
৩ নভেম্বর সাজা ঘোষণা করেন বিচারক জেরেমি কুক। বাটের দুই বছর ছয় মাস, আসিফের এক বছর, আমিরের ছয় মাস এবং মাজহার মাজিদের দুই বছর আট মাসের কারাদণ্ড হয়।

কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনজনই ক্রিকেটে ফেরার চেষ্টা করেন। ২০১৩ সালে সালমান বাট প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাট ও আসিফ প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফেরার অনুমতি পান। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ফিরে সেঞ্চুরিও করেন বাট।
তবে আমিরের প্রত্যাবর্তন ছিল সবচেয়ে আলোচিত। সতীর্থদের একাংশের অনীহা, দর্শকদের বিদ্রূপ। সবকিছুর মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। নিউজিল্যান্ড সফরে দর্শকেরা টাকার নোট নেড়ে তাঁকে ব্যঙ্গ করেন। সতীর্থ মোহাম্মদ হাফিজ এগিয়ে এসে তাঁকে আড়াল করেন। এরপরও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন আমির।
২০১৯ সালে টেস্ট এবং ২০২০ সালে সাদা বলের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। ২০২৪ সালে অবসর ভেঙে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেললেও পরে আবার অবসর ঘোষণা করেন। ২০২৫ সালে টি-টোয়েন্টিতে ৪০০ উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটেও শুরু করেন নতুন অধ্যায়।

অন্যদিকে সালমান বাট এখন ক্রিকেট বিশ্লেষণ ও ধারাভাষ্যের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৩ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড তাঁকে নির্বাচক প্যানেলের পরামর্শক করলেও সমালোচনার মুখে পরদিনই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। আর মোহাম্মদ আসিফ অনেকটাই আড়ালে চলে গেছেন। ২২ টেস্টে তাঁর ১০৫ উইকেট আজও মনে করিয়ে দেয়, কত বড় প্রতিভা ছিলেন তিনি!
লর্ডসের সেই ঘটনার ১৬ বছর পরও প্রশ্ন থেকে যায়, আমির যদি সেদিন ওই প্রস্তাবে রাজি না হতেন, তাঁর ক্যারিয়ার কোথায় গিয়ে দাঁড়াত? আসিফ কি হয়ে উঠতেন বিশ্বের অন্যতম সেরা সুইং বোলার? আর সালমান বাটের নেতৃত্বে পাকিস্তান ক্রিকেটই বা কতটা এগোতে পারত?
এটাই বোধহয় প্রকৃতির চিরন্তন বিধান; কিছু অপূর্ণতা মেনে নিতে হয়, কিছু না-পাওয়ার বেদনায় নীরবে হাহাকার করে যেতে হয় আমৃত্যু।












