ফুটবল যদি হয় ক্যানভাস, তবে জিনেদিন জিদান ছিলেন সেই ক্যানভাসের সবচেয়ে নিপুণ চিত্রশিল্পী। সবুজ ঘাসের বুকে তাঁর বুটের ছোঁয়া যেন তুলির আঁচড় কাটত, যেখানে প্রতিটি পাস, প্রতিবার বল স্পর্শ যেন হয়ে উঠতো এক একটি কবিতা। তিনি শুধু খেলতেন না, তিনি মাঠে মহাকাব্য রচনা করতেন, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ফ্রান্স ফুটবলের আকাশে তিনি ছিলেন এক মহীরূহ, এক অতন্দ্র প্রহরী। ১৯৯৮ সালের সেই রূপকথা আজও ফরাসিবাসীর মনে অম্লান, যেখানে একার কাঁধে তিনি দেশকে এনে দিয়েছিলেন বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপা। তাঁর হাত ধরেই ফরাসি ফুটবলে এক সোনালী রেনেসাঁর সূচনা হয়েছিল, যা তাদের জাত চিনিয়েছিল পুরো বিশ্বের দরবারে।
মাঝমাঠের এই জাদুকরের প্রভাব ফরাসি ফুটবলে কতটা গভীর ছিল, তা বোঝা যায় তাঁর অবসর ভেঙে ফেরার গল্পে। তাঁর দলে প্রত্যাবর্তনকে থিয়েরি অরি তুলনা করেছিলেন খোদ ‘ঈশ্বরের ফিরে আসার’ সাথে। জিদান মাঠে থাকা মানেই ছিল দলের মাঝে এক অদ্ভুত শক্তির সঞ্চার হওয়া, এক পরম নির্ভরতার প্রতীক।

তবে নিয়তির স্ক্রিপ্ট সবসময় মসৃণ হয় না। ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে, আরেকটা বিশ্বকাপের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের আবেগে ভেঙে গিয়েছিল সারাজীবনের আত্মসংযমের বাঁধ। সেই একটি লাল কার্ড, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত, যার আফসোস হয়তো আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে এই মহানায়ককে। বিদায়টা বিষাদময় হলেও, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে তা মলিন করতে পারেনি।
জিজু মানেই ছিল আভিজাত্য, জিজু মানেই ছিল মাঠের ভেতরে এক অদ্ভুত নীরব রাজত্ব। পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি ফরাসি ফুটবলকে যা দিয়েছেন, তা কোনো ট্রফি বা পদকের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তিনি ফরাসিদের শিখিয়েছেন কীভাবে বুক চিতিয়ে লড়তে হয়, কীভাবে শিল্প দিয়ে ফুটবলকে জয় করতে হয়।
আজ ঘড়ির কাঁটা ঘুরে আবারও দুয়ারে কড়া নাড়ছে আরেকটি নতুন বিশ্বকাপ। ফুটবল মাঠে এখন গতির ঝড় আছে, নিখুঁত সব কৌশল আছে, কিন্তু বড্ড অভাব জিদানের মতো একজন ফুটবল-শিল্পীর। আধুনিক যান্ত্রিক ফুটবলের ভিড়ে চোখ দুটো আজও ব্যাকুল হয়ে খোঁজে সেই চেনা জাদুকরকে, যিনি পায়ের জাদুতে স্তব্ধ করে দিতেন পুরো বিশ্ব।











