সাও পাওলোর ঘিঞ্জি গলিতে রুগ্ন এক বালক ছুটছে। পায়ে অগোছালো একটা বল, শরীর ঘামে ভিজে চুপচুপে। পেটে খিদে, তবুও ক্লান্তি নেই এক বিন্দু। লক্ষ্য একটাই, গোল করতে হবে, বল ওই লক্ষ্যভেদ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজেকে বিলিয়ে দিতে হবে, ড্রিবলিং দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে মিশিয়ে দিতে হবে মাটির সাথে।
ফুটবল মানেই তো জীবন, সেই জীবনে লড়তে হবে নিজের শেষ সামর্থ্য অবধি। ওই লড়াইটা সাও পাওলোর গলিতে, ফ্ল্যামেঙ্গোর মাঠে, ব্রাজিলের ময়দানে শিখে এসেছেন ভিনিসিয়াস। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে আজকাল যা করছেন, সেটার শিক্ষা কিংবা দিক্ষা ভিনি পেলে পেয়ে গেছেন সেই শৈশবেই।
ফুটবলের সবুজ ক্যানভাসে রিয়াল মাদ্রিদের সাদা জার্সিতে তিনি এক অপ্রতিরোধ্য গতির নিখুঁত জাদুকর তিনি। বাঁ-প্রান্ত দিয়ে ডিফেন্ডারদের নাচিয়ে যখন ভিনিসিয়াস জুনিয়র বল নিয়ে বক্সে ঢোকেন, সান্তিয়াগো বার্নাব্যু মেতে ওঠে চরম উল্লাসে। কিন্তু, সেই চেনা ছন্দ কেন যেন থমকে যায় হলুদ জার্সিতে।

ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী সেলেসাও জার্সি গায়ে জড়ালেই যেন ভিনির সেই চেনা জাদু উধাও হয়ে যায়। ক্লাব ফুটবলের রাজপুত্র জাতীয় দলে এসে হয়ে যান বড্ড ম্লান, বড্ড অচেনা। কোটি ভক্তের বুকভরা প্রত্যাশা প্রতিবারই রূপ নেয় এক বুক হতাশায়।
পরিসংখ্যানও যেন তাঁর এই ছায়ায় ঢাকা পারফরম্যান্সের কথাই বলছে। ২০১৯ সালে অভিষেকের পর থেকে জাতীয় দলের হয়ে ৪৭ ম্যাচে মাত্র ৮টি গোল আর ৮টি অ্যাসিস্ট বড্ড বেমানান তাঁর প্রতিভার তুলনায়। দেশের হয়ে এই অতি-সাধারণ ফর্ম কোনোভাবেই ভিনি-সুলভ নয়। বরং, ব্রাজিলের হয়ে তাঁকে দেখা যেন মনে বেদনার জন্ম দেয় সময়ে সময়ে।
তবে সব অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ যেন এবার চলে এসেছে ভিনির হাতের মুঠোয়। আমেরিকা, কানাডা আর মেক্সিকোর মাটিতে দুয়ারে কড়া নাড়ছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। ভিনির সামনে সুযোগ নিজেকে ব্রাজিলের আসল ত্রাণকর্তা হিসেবে প্রমাণ করার, বিশ্বমঞ্চে নিজের সক্ষমতার সবটুকু ঢেলে দেওয়ার।

২০০২ সালের পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখা হয়নি সেলেসাওদের। হেক্সার সেই অনন্ত অপেক্ষা শুধু বেড়েই চলেছে। ব্রাজিলের ফুটবলীয় অহংকার আজ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এক বড় ক্ষুধার্ত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু, এর আগে প্রত্যেকবার মাথা নিচু করে স্টেডিয়াম ছেড়ে বের হয়ে আসতে হয়েছে।
হেক্সার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে ভিনিসিয়াসকে এবার জ্বলে উঠতেই হবে। যদিও নেইমার জুনিয়র দলে আছেন কিন্তু ব্রাজিলের আক্রমণের মূল ব্যাটনটা এখন তাঁকেই নিজের হাতে তুলে নিতে হবে। ক্লাবের সেই বিধ্বংসী রূপ যদি তিনি বিশ্বকাপে দেখাতে পারেন, তবেই ব্রাজিলের বিশ্বজয়ের আশাটা বাস্তবে রূপ নেবে।
এবারের বিশ্বকাপ ভিনির জন্য মহাতারকা হয়ে ওঠার শ্রেষ্ঠ মঞ্চ। সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে সাম্বার চিরন্তন ছন্দে বিশ্ব কাঁপানোর এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। ভিনি নিজের সেরাটা দিলে, হেক্সার অধরা স্বপ্ন ছোঁয়া ব্রাজিলের জন্য অসম্ভব কিছু নয়।

ফুটবল বিশ্ব চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে ভিনিসিয়াসের সেই গতি আর জাদুকরী ড্রিবলিংয়ের অপেক্ষায়। এবার কি তবে উত্তর আমেরিকার মাঠে দেখা যাবে ভিনির সেই রাজকীয় রূপ? চেনা হাসি মুখে সোনালী শিরোপা হাতে নিয়ে ব্রাজিলের হেক্সা নামক মহাকাব্যের মূল নায়ক ভিনি হতে পারেন কিনা তা সময়ই বলে দেবে।










