ইতিহাসের ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার নামই ফুটবল। ২০১০ সালের বিশ্বজয়ের মহাকাব্য, ২০১৪ সালের ট্র্যাজিক পতন, আর এখন এক ১৮ বছর বয়সী কিশোরের জাদুকরী বাঁ-পায়ে ভর করে নতুন ভোরের স্বপ্ন! স্প্যানিশ ফুটবলের এই রোমাঞ্চকর উত্থান-পতনের গল্প রূপকথাকেও হার মানায়।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুর আগ পর্যন্ত স্পেনের ফুটবল ইতিহাস ছিল মূলত একরাশ আক্ষেপের গল্প। ডি স্টেফানো, জেন্টো, রাউল কিংবা হিয়েরোর মতো মহীরুহরা যে জার্সি গায়ে জড়িয়েছেন, তাতে বিশ্বজয়ের কোনো সোনালী তারা ছিল না। বড় মঞ্চে স্নায়ুর চাপ ধরে রাখতে না পারার এক অদ্ভুত অপবাদ তাড়া করে বেড়াত স্প্যানিশদের।
সেই দেয়াল প্রথম ভেঙে চুরমার হয় ২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে। প্রাজ্ঞ কোচ লুইস আরাগোনেসের হাত ধরে ৪৪ বছরের খরা কাটায় স্পেন। শুরু হয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ফুটবল সাম্রাজ্যবাদের।

এরপর ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ। ক্যাসিয়াস, রামোস, জাভি ও ইনিয়েস্তাদের নিয়ে গড়া সেই দলটির বিশ্বজয়ের পথ সহজ ছিল না। প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হোঁচট খাওয়ার পর, কোয়ার্টার ও সেমিফাইনালে প্যারাগুয়ে এবং জার্মানির বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পার করে ফাইনালে পা রাখে তারা।
১১ জুলাই সকার সিটিতে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে সেই ফাইনালটি ছিল চরম নাটকীয়। ক্যাসিয়াসের সেই অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ আর অতিরিক্ত সময়ে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার জাদুকরী গোল। লা রোহার বুকে যুক্ত করে প্রথম বিশ্বজয়ের তারকা। ২০১২ সালের ইউরো জিতে তারা শ্রেষ্ঠত্বকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। কিন্তু কে জানত, সেই রূপকথার সমাপ্তি লুকিয়ে ছিল ঠিক তার পরের অধ্যায়েই?
স্পেনের পতনের বিষাদময় সুর বেজেছিল ২০১৩ সালের মারাকানায়। কনফেডারেশনস কাপের ফাইনালে নেইমার-ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হওয়াই ছিল মহাবিপর্যয়ের পূর্বাভাস। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেলতে এসে গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচেই স্পেনের বিদায় ঘণ্টা বেজে যায়।

এই ধাক্কার পর ক্যাসিয়াস কিংবা পুয়োলের মতো যোগ্য বিকল্প খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় নতুন প্রজন্ম। ফলস্বরূপ, বিশ্বমঞ্চে নিজেদের হারিয়ে খোঁজা স্পেন ২০১৮ সালের রাশিয়া এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে টানা দুই বার শেষ ১৬ থেকেই বিদায় নিয়ে নেয়।
ঘনীভূত অন্ধকারের মাঝেই স্পেনের ফুটবলে আলোর মশাল জ্বেলে ওঠে বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি ‘লা মাসিয়া’। আর সেই আলোর নাম – লামিন ইয়ামাল। ২০২৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলে পা রাখেন তিনি।
পেশাদার অভিষেকের মাত্র এক বছরের মাথায়, এই ইয়ামাল ম্যাজিকেই ইউরো ২০২৪ এর মুকুট পুনরুদ্ধার করে স্পেন। ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে লা রোহারা বিশ্বকে জানিয়ে দেয় তারা তাদের হৃত সাম্রাজ্য ফিরে পেতে প্রস্তুত।

ইয়ামালের সাথে নিকো উইলিয়ামস, পেদ্রি ও গাভিদের মতো একঝাঁক তরুণ তুর্কি মিলে তৈরি করেছেন এমন এক বিধ্বংসী ব্রিগেড, যাদের ওপর ভর করে ২০২৬ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সোনালী তারকার স্বপ্ন দেখছে পুরো স্পেন।











