মাঠে তাঁর উপস্থিতিই যেন আলাদা একটা বিনোদন। তিনি পারফরম করুন আর নাই করুন, চোখ আটকে থাকে তাঁর দিকেই। বিশেষ করে উইকেট পতনের পর সেই নাচ। বয়স যত বেড়েছে, নাচটা যেন ততই বেপরোয়া হয়েছে। তিনি ক্রিকেটের সত্যিকারের ‘চ্যাম্পিয়ন’।
অবিসংবাদিত রকস্টার তিনি ছিলেন ক্যারিয়ারের শেষ দিন পর্যন্ত। সত্যিকারের অলরাউন্ডার বলতে যা বোঝায়, ব্রাভো ঠিক তাই ছিলেন। ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ফিনিশার। পরিস্থিতি বুঝে ব্যাট করায় তাঁর জুড়ি ছিল না। বল হাতে ডেথ ওভারের তুখোড় বোলার। পেস বোলিং অলরাউন্ডারদের মধ্যেও তিনি ছিলেন বিরল এক প্রজাতি।
আর ফিল্ডিং ছিল বিশ্বমানের। বয়স যাই হোক, তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল তাঁর। হাঁটুর বয়সী ক্রিকেটাররা যতই অ্যাক্রোব্যাটিক ফিল্ডিং করুক, ব্রাভো ছিলেন তাঁদের হেড মাস্টার।
অধিনায়কত্বে কখনো স্থায়ী হননি। কিন্তু যতটুকু সময় ছিলেন, তাতেই বুঝিয়েছেন তিনি শুধু অধিনায়ক নন, নেতা। নেতৃত্বের পথে আপস করেননি। আর তাই বিতর্কও এসেছে বারবার।
দু’টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সদস্য ব্রাভো। বোর্ডের সঙ্গে শত ঝামেলা, বিবাদ, টানাপোড়েনের পরও প্রয়োজনের সময় ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট বারবার তাঁর কাছেই ফিরেছে। আর ব্রাভোও ফিরেছেন। ফিরে এসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে এন্টারটেইন করেছেন।

বয়স তাঁর কাছে কোনো ঘটনাই নয়। টি-টোয়েন্টির ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ৫০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার পর বলেছিলেন, ‘৪০ বছর বয়স এখন নিউ ৩০।’
মাঠের বাইরে অবশ্য ব্রাভোর আরেক দুনিয়া। সেখানে তিনি ক্রিকেটার নন, পুরোদস্তুর এন্টারটেইনার। ‘চ্যাম্পিয়ন’ গান দিয়ে বিশ্ব মাতিয়েছেন। তামিল ছবিতে কোমর দুলিয়েছেন। ক্রিকেটের বাইরে গিয়েও নিজেকে বানিয়েছেন রকস্টার।
আধুনিক ধুন্ধুমার টি-টোয়েন্টির যুগে ব্যাট, বল আর ফিল্ডিংয়ে এমন বিনোদন একসঙ্গে দিতে পেরেছেন, এমন ক্রিকেটার খুব বেশি নেই।
কিন্তু ব্রাভো আসলে কী পারেন না? ২০০৫ সালে হোবার্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সেঞ্চুরিটাই ধরুন। সামনে গ্লেন ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন, ব্রেট লি, স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের মতো বোলার। তারার মেলা সেই আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন ব্রাভো।
৪০ টেস্টের ক্যারিয়ারও মন্দ নয়। প্রায় দুই হাজার রান, একশর কাছাকাছি উইকেট। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট তাঁর শেষ ঠিকানা ছিল না। তিনি চলে গেলেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দুনিয়ায়। আর সেখানেই হয়ে উঠলেন বিশ্বজুড়ে বিনোদনের ফেরিওয়ালা।

২০০৬ সালে ভারত গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটি হেরে চাপে ক্যারিবিয়ানরা। দ্বিতীয় ম্যাচে শেষ মুহূর্তে ভারতের দরকার দুই রান। ৯৩ রানে অপরাজিত যুবরাজ সিং। ম্যাচ শেষ করার অপেক্ষা।
ব্রাভো এলেন আক্রমনে। ইয়র্কারে বিভ্রান্ত যুবরাজ। বল গিয়ে আঘাত করল স্টাম্পে। সিরিজের সেই লড়াই শেষ পর্যন্ত ৪-১ ব্যবধানে জিতল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে তখন ব্রাভোর চাহিদা আকাশছোঁয়া। তাঁকে পাওয়ার জন্য দলগুলো যে কতটা করতে পারে, তার গল্পও আছে।
২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ আর আইপিএলের সূচি নিয়ে সমস্যা তৈরি হলো। ব্রাভো তখন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে। তাঁকে সময়মতো জ্যামাইকায় প্রথম টেস্ট খেলতে ফিরতে হবে।
সমাধান করলেন মুকেশ আম্বানি। ব্রাভোকে সময়মতো ফেরাতে নিজের জেট বিমানই দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এটাই ছিল ব্রাভোর বাজারমূল্য। তবে ব্রাভো একই সঙ্গে ছিলেন এক রহস্যময় চরিত্রও।

২০১০ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ডের ৮০ হাজার ডলারের চুক্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বোর্ড তাঁকে ‘এ’ দলের হয়ে ইংল্যান্ড সফরে পাঠাতে চেয়েছিল। ব্রাভো বরং চেন্নাইয়ের হয়ে আইপিএল খেলাকেই বেছে নিয়েছিলেন।
বোর্ডের সঙ্গে সম্পর্কের রং এরপর বারবার বদলেছে। ২০১২ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য। ২০১৩ সালে ওয়ানডে অধিনায়ক। এক বছরের কেন্দ্রীয় চুক্তিতেও সই করেছিলেন।
কিন্তু সেটা ছিল ঝড়ের আগের সময়। পরের বছরই ভারত সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সেই আলোচিত, বিতর্কিত প্রত্যাবর্তনের ঘটনা। ব্রাভো ছিলেন সেই দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। এরপর ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দিকেই মনোযোগ বাড়ে তাঁর।
চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে তিনি হয়ে উঠলেন আলাদা এক চরিত্র। ব্যাট হাতে রান, বল হাতে উইকেট, মাঠে দুর্দান্ত ফিল্ডিং, আর উইকেট পেলেই সেই নাচ।
ক্রিকেটের সঙ্গে বিনোদনকে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা খুব কম ক্রিকেটারের ছিল। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ফিরেছেন বারবার। বিশ্বকাপের মঞ্চেও ফিরেছেন। বয়সকে পাশ কাটিয়ে। এ কারণেই ব্রাভোর গল্পটা শুধু একজন অলরাউন্ডারের গল্প নয়।

এটা একজন ক্রিকেটারের গল্প, যিনি ব্যাট হাতে ম্যাচ জিতিয়েছেন। বল হাতে ম্যাচ ঘুরিয়েছেন। ফিল্ডিংয়ে চমক দেখিয়েছেন। নেতৃত্বে বিতর্ক তৈরি করেছেন। বোর্ডের সঙ্গে লড়েছেন। আবার সেই বোর্ডের হয়েই ফিরেছেন।
আর মাঠের বাইরে গান গেয়েছেন, নেচেছেন, মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন। ডোয়াইন ব্রাভো আসলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের একটা চরিত্র। এমন এক চরিত্র, যাকে শুধু রান আর উইকেট দিয়ে মাপা যায় না। অনেকটা ওয়াইনের মতো তিনি। যত পুরনো হয়েছেন, ততই যেন নেশা বাড়িয়েছে তাঁর ক্রিকেট।










