রহস্যের নাম লিটন!

তিন সংস্করণেই উইকেট সামলানোর পাশাপাশি ব্যাটিংয়ের গুরুদায়িত্ব পালন করা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড্ড বিরল এক দৃশ্য। লিটন এই কাজটাই করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে।

ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে লিটন দাস নামটা এক অমীমাংসিত রহস্যের মতো। কখনো বাইশ গজে ছড়ান রাজকীয় দ্যুতি, আবার কখনো ডুবেন চরম ব্যর্থতায়। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম এক নান্দনিক ব্যাটার লিটনকে ঘিরে ভক্তদের মাঝে ভালোবাসার চেয়ে বিস্ময়টাই বেশি। চেনা ছন্দের লিটন যখন উইকেটে রাজত্ব করেন, তখন মাঠের নান্দনিকতা যেন এক স্বর্গীয় রূপ নেয়।  

তিন সংস্করণেই উইকেট সামলানোর পাশাপাশি ব্যাটিংয়ের গুরুদায়িত্ব পালন করা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড্ড বিরল এক দৃশ্য। লিটন এই কাজটাই করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে। তবে এই রাজকীয় পথটা লিটনের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়া, ব্যাটিং অর্ডারের অবিন্যস্ত পরিবর্তন আর নির্বাচকদের আস্থার অভাব—সব মিলিয়ে এক চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে লিটনকে। 

বিগত ২০২৩ বিশ্বকাপের দুঃসহ স্মৃতি হাতড়ে আক্ষেপের সুরে ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লিটন বলেন, ‘বিশ্বকাপে দুটি ফিফটির জায়গায় যদি দুটি সেঞ্চুরি করতে পারতাম, তবে গল্পটা আজ অন্যরকম হতো। অথচ বিশ্বকাপ খোলার পরপরই আমার ব্যাটিং পজিশন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হলো, যা একজন সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে আমাকে মানসিকভাবে বেশ আঘাত করেছিল।’

সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে লিটন আবারও একদিনের ক্রিকেটে নিজের চেনা ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন, যার প্রমাণ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করা দুর্দান্ত ৭৬ রান। আর এবার দীর্ঘ ১১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ঘরের মাঠে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন তিনি। অজিদের বিপক্ষে এই দ্বিপাক্ষিক সিরিজকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন লিটন।

কিপিংয়ের ক্লান্তি কাটিয়ে টেস্টে ব্যাটিং করাকে লিটন মনে করেন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। সম্প্রতি পাকিস্তানের বিপক্ষে দল যখন মাত্র ১১৬ রানে ছয় উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, তখন টেইল-এন্ডারদের নিয়ে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়া এক সেঞ্চুরি করেন লিটন। দুই বছর আগে পাকিস্তানের মাটিতে ২৬ রানে ছয় উইকেট হারানোর পর করা সেঞ্চুরিই যেন আবার দেশের মাটিতে করে দেখালেন এই ব্যাটার।  

নিজের এই অনবদ্য সেঞ্চুরি নিয়ে তৃপ্তির সুরে লিটন বলেন, “ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরি সবসময়ই আনন্দের, কিন্তু যখন সেই সেঞ্চুরি দলের জয়ে অবদান রাখে, তখন তা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো।” একইসাথে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্বকেও গত বারো মাস ধরে দারুণ উপভোগ করছেন বলে জানান তিনি।

৩৩ বছর বয়সে এসেও লিটন নিজেকে কোনো আদর্শ রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান না। বরং তরুণদের উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘আমাকে অনুসরণ না করে আমার চেয়েও বড় কাউকে নিজের রোল মডেল বানাও, যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও অন্তত লিটন দাসের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারো।’

নানা সময়ে লিটনের ব্যাট হাতে রান না পাওয়া কষ্ট দিয়েছে ভক্তদের মনে। সাম্প্রতিক সময়ে ভালো ছন্দে থাকা লিটনই সবার কাছে আরাধ্যের বস্তু। নান্দনিক এই ব্যাটার যাতে নিজের ফর্ম ধরে রাখতে পারেন আরও লম্বা সময় ধরে, এই কামনাই থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভক্তদের। 

লেখক পরিচিতি

বেঁচে আছি না পড়া বইগুলো পড়ব বলে

Share via
Copy link