বিরাট কোহলি ছিলেন ব্র্যান্ড, রোহিত শর্মা ছিলেন মেজাজি জাদুকর — আর তাদের মাঝে, নি:শব্দে, নিজের কাজটা করে যেতেন একজন মানুষ। আজিংকা রাহানে। যতটা আলোচনায় থাকা উচিত ছিল, ততটা কখনোই তিনি পাননি। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে যখন তার ব্যাট সবচেয়ে বেশি কথা বলত, তখনও এই শান্ত মানুষটাকে নিয়ে হইচই হতো সবচেয়ে কম। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া এক নীরব যোদ্ধা, যে দলের জন্য দিয়ে গেছে অনেক কিছু, বিনিময়ে চায়নি তেমন কিছুই।
২০২০ সালের ডিসেম্বর। অ্যাডিলেডে ভারত অলআউট মাত্র ৩৬ রানে — টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জার সংখ্যাগুলোর একটা। বিরাট কোহলি দেশে ফিরে গেছেন পিতৃত্বকালীন ছুটিতে। দলের রাশ তখন এক শান্ত, স্থিতধী মানুষের হাতে — আজিঙ্কা রাহানে।
কেউ ভাবেনি সেই ভাঙাচোরা দল মেলবোর্নে ফিরে দাঁড়াবে। কিন্তু রাহানে বক্সিং ডে টেস্টে নিজে সেঞ্চুরি করে, নীরবে নেতৃত্ব দিয়ে ভারতকে জিতিয়ে দিলেন। সিরিজ শেষ হলো ২-১ ব্যবধানে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস লিখে।

সেই মানুষটাই আজ থামলেন — শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নয়, ক্রিকেটের সব রূপ থেকেই। বৃহস্পতিবার ইনস্টাগ্রামে এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় বিদায়ের কথা জানালেন আজিংকা রাহানে। ক্যাপশনে লিখলেন — ‘ক্যাপ ২৭৮ বিদায় নিচ্ছে। বছরের পর বছর ভালোবাসা আর সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ।’
ডোম্বিভলি থেকে মুম্বাইয়ের অনুশীলন মাঠে যাতায়াত করা এক তরুণের গল্প শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে, শেষ হলো দীর্ঘ পথ পেরিয়ে। ৮৫টি টেস্ট খেলে করেছেন ৫০৭৭ রান, সেঞ্চুরি ১২টি — যার আটটাই দেশের বাইরে, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডে একটি করে, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে দুটি করে।
২০১৪ সালে লর্ডসে তার সেঞ্চুরি এখনও অমলিন। অধিনায়ক হিসেবে ৬টা টেস্টে দল চালিয়েছেন, জিতেছেন ৪টায় — যার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টাই ওই ৩৬ অলআউটের পর অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসা। সাদা বলের ক্রিকেটেও কম যাননি। খেলেছেন তিনটা বিশ্বকাপ — ২০১৪ আর ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, আর ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ।

আইপিএলে ২০০৮ সালের উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে ২০২৬ পর্যন্ত খেলেছেন, বাদ পড়েছিলেন কেবল ২০১০ মৌসুমে। ছয়টা ফ্র্যাঞ্চাইজি ঘুরে ২০২৩ সালে চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে জিতেছেন একমাত্র শিরোপা। আর বিদায়ী মৌসুমেও, ২০২৬ সালে কেকেআরের অধিনায়ক হিসেবে করেছেন ৩৩৫ রান — আইপিএল ক্যারিয়ারের মোট রান দাঁড়িয়েছে ৫৩৬৭-তে।
মুম্বাই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আজিংকা নায়েক তার বিদায়কে ভারতীয় ক্রিকেটের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি বলে বর্ণনা করেছেন, প্রশংসা করেছেন তার নিষ্ঠা আর চাপের মুখে অবিচল থাকার ক্ষমতাকে।
নিজের বার্তায় রাহানে বলেছেন, জীবনের প্রতিটা জিনিসেরই শুরু আছে, শেষও আছে। মারাঠি ভাষায় বিশেষ করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন ভক্তদের, বলেছেন — ‘আজিঙ্কা’ মানে অপরাজেয়, অথচ ক্রিকেট তাকে বহুবার হারিয়েছে। তবু একটা জায়গায় তিনি কখনো হারেননি — কোটি ভক্তের হৃদয়ে।

ইতিহাস মনে রাখে চিৎকার করা নায়কদের। কিন্তু কিছু নায়ক থাকে নি:শব্দ — যাদের অবদান বোঝা যায় অনেক পরে, যখন তারা আর মাঠে নেই। আজিংকা রাহানে তেমনই একজন। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া, অথচ ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরকাল লেখা থাকবে যার নাম।










