পাদপ্রদীপ থেকে দূরে থাকা এক গোলশিকারীর গল্প

পাদপ্রদীপে থাকা, বা না থাকা কখনোই লেভানডফস্কির গোল শিকারের প্রতিভাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবে না! ক্লাব ও দেশের হয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিটার দিকে চোখ রাখলেই সেটা পরিষ্কার হয়।

ফুটবলে সেরা স্ট্রাইকারদের নামের তালিকায় বোল্ড অক্ষরে সবসময়ই ঠাঁই পান সময়ের সেরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র দ্য সিলভা, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা রবার্ট লেওয়ানডস্কি। তবু এই তারকাদের মধ্যে পাদপ্রদীপের ছায়া থেকে রবার্ট লেওয়ানডস্কি  অবস্থান যেন বেশ খানিকটা দূরেই!

জাতীয় দল কিংবা ক্লাব ফুটবল, উভয় পর্যায়েই গোল করায় অসাধারণ নৈপুণ্য রয়েছে লেওয়ানডস্কি। তবু গণমাধ্যমে রোনালদো, নেইমার, মেসি বা এমবাপ্পেকে নিয়ে যেমন শোরগোল দেখা যায়, তাঁর ছিটেফোঁটাও নেই লেওয়ানডস্কি নিয়ে। জাতীয় দলের হয়ে তেমন কোনো অর্জন না থাকাই কি এই অবজ্ঞার নেপথ্য কারণ?

সে যাই হোক, ১৯৮৮ সালের ২১ আগস্ট পোল্যান্ডের ওয়ারশতে জন্মানো এই স্ট্রাইকার ১৮ বছর বয়সে ডেল্টা ওয়ারশ ক্লাবে প্রথম পেশাদার ফুটবলে যাত্রা শুরু করেন। পরে লেগিয়া ওয়ারশ ক্লাব ও নিক প্রুজকোর যুব দলে খেলেন তিনি। লেক পোজনানের হয়ে ২০০৯-১০ মৌসুমে পোলিশ লিগের শীর্ষ স্তরে অভিষেক ঘটে তাঁর। সেবারই ক্লাবটির হয়ে পোলিশ লিগের শিরোপা জয়ের স্বাদ পান লেভা। ১৮ গোল করে মৌসুমটির সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতিও পান তিনি।

সেই মৌসুমে তাঁর ক্ষুরধার অ্যাটাকিং ট্যাকটিক্স, ইউনিক সুযোগ সৃষ্টির দক্ষতা, প্রতিপক্ষের রক্ষণের সূক্ষ্ম গ্যাপ খুঁজে বের করার নৈপুণ্যে বিমোহিত হয়ে জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড কিনে নেয় তাঁকে। ২০১০ সাল থেকে জার্মান ক্লাবটির হয়ে চার মৌসুমে নজরকাড়া পারফরম্যান্স করে দুটি বুন্দেসলিগা শিরোপা জেতেন তিনি। অর্জন করেন উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রানার্সআপ হওয়ার গৌরবও। ক্লাবটির হয়ে মোট ১৩১ ম্যাচে ৭৪ গোল করেন এই পোলিশ ফুটবলার। এতে তাঁর খ্যাতি বিশ্বের সকল প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে যায়।

ফলাফল? ডর্টমুন্ডের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী জার্মান জায়ান্ট বায়ার্ন মিউনিখ ২০১৪-১৫ মৌসুমে ১০ মিলিয়ন ইউরোতে দলে ভেড়ায় এই গোল মেশিনকে। আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় থিতু হয়ে নিজের গোল ক্ষুধাকে শিখরে নিয়ে যান এই ফরোয়ার্ড!

২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বুন্দেসলিগায় এক অনন্য নজির গড়েন তিনি। বায়ার্নের হয়ে ভলফসবুর্গের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র আট মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে পাঁচ গোল করে গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকে নিজের নাম লেখান এই ফরোয়ার্ড! একইসঙ্গে মাত্র চার মিনিটের ব্যবধানে হ্যাটট্রিক করে বুন্দেসলিগার দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ডও লুফে নেন তিনি।

আট মৌসুমে ব্যাভারিয়ানদের হয়ে ২৫৩ ম্যাচে ২৩৮টি গোল করেন এই তারকা। জেতেন টানা আটটি বুন্দেসলিগা টাইটেল। ২০২০ সালে বায়ার্নকে জেতান মহাদেশীয় ট্রেবলও। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের বদৌলতে ২০২০ ও ২০২১ সালে টানা দুবার ফিফার বর্ষসেরার মুকুট জয় করেন লেওয়ানডস্কি। সে সময়ে দুবার ইউরোপীয় গোল্ডেন শ্যুও জেতেন এই ক্ল্যাসিক নাম্বার নাইন!

বায়ার্ন মিউনিখে অনবদ্য পারফরম্যান্সের সুবাদে ২০২২ সালে ৫০ মিলিয়ন ইউরোতে লেভাকে কিনে নেয় বিশ্বখ্যাত ক্লাব বার্সেলোনা। কাতালানদের হয়ে গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন যথারীতি এই পোলিশ স্ট্রাইকার। চার বছরে ক্লাবটিতে ১৩৪ ম্যাচে ৮৩ গোল করেন লেওয়ানডস্কি। বার্সাতেও টানা ছয় মৌসুম ধরে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ড ধরে রাখেন তিনি।

রবার্ট লেওয়ানডস্কি পোল্যান্ড জাতীয় দলের ইতিহাসেরও সর্বকালের সেরা গোলশিকারী। ১৬৭ ম্যাচে তাঁর ৮৯টি আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড সেটিরই জানান দেয়। দেশের জার্সিতে ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ এবং চারটি ইউরো আসরে খেলেছেন এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার। তবে কোনো মেজর অর্জন ছাড়াই হতাশাজনকভাবে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে।

সুইডেনের কাছে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্লে-অফে হেরে থমকে যায় তাঁর বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন। ম্যাচটি শেষে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাই ‘টাইম টু সে গুডবাই’ গান পোস্ট করে জাতীয় দলকে বিদায় জানান ১৩ বার পোল্যান্ডের সেরা ফুটবলার নির্বাচিত হওয়া এই স্ট্রাইকার।

তবে ৩৭ বছর বয়সেও এখনো লেভা মহাপ্রতাপে খেলে যাচ্ছেন ক্লাব ফুটবলে। চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমে তিনি নাম লিখিয়েছেন মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) শিকাগো ফায়ারে।

পোল্যান্ডকে হয়তো আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে লেভার মতো আরেকজন দক্ষ গোলমেশিনকে খুঁজে পেতে। কিন্তু ফুটবল বিশ্ব তাঁকে চিরকাল মনে রাখবে একজন সত্যিকারের কিংবদন্তি হিসেবে। তাই পাদপ্রদীপে থাকা, বা না থাকা কখনোই লেওয়ানডস্কির গোল শিকারের প্রতিভাকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবে না! ক্লাব ও দেশের হয়ে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিটার দিকে চোখ রাখলেই সেটা পরিষ্কার হয়।

লেখক পরিচিতি

সাব এডিটর

ত্রিদেশীয় সিরিজে তুরুপের তাস কারা?

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশের ওয়ানডে দলে হাসান মাহমুদের প্রত্যাবর্তন, তবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত পারফরম্যান্সে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়ে চলেছেন হাসান! লাল বলের ক্রিকেটে তাঁর বোলিংয়ের ধার এবার সাদা বলেও দেখতে চাইবে লাল-সবুজের পতাকাবাহীরা। গতি, নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেংথ আর ব্যাটারকে ভুল করতে বাধ্য করার দক্ষতা তাঁকে করে তুলতে পারে পেস আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নতুন বলে উইকেট তুলে নেওয়া থেকে শুরু করে মাঝের ওভারে রান আটকে রাখা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা হতে পারে তাৎপর্যপূর্ণ। টেস্টের আত্মবিশ্বাস ওয়ানডেতেও অনূদিত হলে হাসানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের বোলিংয়ে যোগ করতে পারে বাড়তি ধার। তবে একাদশে সরাসরি জায়গা পাবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়ের জায়গা।

শিরোপার উল্লাসে লেখা হবে জামালের বিদায়গাথা?

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জন্ম নেওয়া জামালের ফুটবলের হাতেখড়ি ইউরোপের যুব ফুটবল কাঠামোয়। ব্রন্ডবি আইএফের যুব দল পেরিয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুযোগ পান এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। সামনে ছিল পেশাদার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ২০০৬ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে, গ্যাং-সংক্রান্ত গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তাঁর শরীরে বিদ্ধ হয় চারটি বুলেট। কয়েক দিন কোমায় থাকার পর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একটা সময় আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, হয়তো আর কখনো ফুটবলে ফেরা হবে না তাঁর। কিন্তু জামাল ফিরলেন, হয়ে রইলেন বাংলাদেশ ফুটবলের এক জীবন্ত কিংবদন্তী!

Share via
Copy link